লোগো

“কথা না শুনলেই রাগ!” ৩ বছরের শিশুর জেদ ও রাগ আসলে কেন বাড়ে?

“কথা না শুনলেই রাগ!”  ৩ বছরের শিশুর জেদ ও রাগ আসলে কেন বাড়ে?

আমার ছেলে যখন দুই বছর পার করে তিনে পা দিল, তখন থেকেই আমি একটা নতুন জিনিস বুঝতে শুরু করি, এই বয়সের বাচ্চাদের মোড কখন কোন দিকে যায়, সেটা বোঝা সত্যিই কঠিন। একটু আগে যে বাচ্চা হাসছিল, পাঁচ মিনিট পর সেই একই বাচ্চা মাটিতে শুয়ে কান্না করছে শুধু একটা বিস্কুট বা খেলনার জন্য। শুরুতে আমি ভাবতাম, হয়তো আমি ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। পরে শিশুদের আচরণ নিয়ে পড়তে গিয়ে বুঝলাম, ২–৪ বছর বয়সে রাগ, জেদ, আবেগের বিস্ফোরণ, এগুলো আসলে খুবই স্বাভাবিক বিকাশের ধাপ।

এই বয়সে শিশুর ব্রেইন-এর ইমোশনাল অংশ খুব একটিভ থাকে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-control) বা হঠাৎ আবেগ/ইচ্ছা দমন করার ক্ষমতা (impulse control)-এর অংশ পুরোপুরি বিকশিত হয় না। তাই তারা তীব্র আবেগ অনুভব করলেও সেটা ম্যানেজ করতে পারে না। ছোট্ট একটা “না” শুনেও তাদের কাছে মনে হয় পুরো পৃথিবী ভেঙে গেছে।
আমার নিজের ছেলের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। একদিন শুধু লাল কাপের বদলে নীল কাপ দেওয়াতে এমন কান্না শুরু করেছিল যে আমি হতবাক। তখন বুঝিনি, ও আসলে কাপের জন্য না, নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর হতাশা থেকে রিয়্যাক্ট (React) করছে।
আমরা বড়রা অনেক সময় ভাবি বাচ্চা ইচ্ছা করে জেদ করছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, ছোট শিশুরা বেশিরভাগ সময় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রাগে ফেটে পড়ে।
আমি আগে একটা ভুল করতাম। ছেলে রাগ করলে আমিও রেগে যেতাম। “চুপ করো!”, “এত জেদ করো কেন?”; এসব বলতাম। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। কারণ শিশুর ব্রেইন তখন অলরেডি ওভারওয়েলমড (Already Overwhelmed) অবস্থায় থাকে। ওই সময় ভয় বা চিৎকার তাদের নার্ভাস সিস্টেম (Nervous System) আরও স্ট্রেসড (Stressed) করে দেয়।
এখন আমি আগে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি। সবসময় পারি না, কিন্তু চেষ্টা করি।
যখন ছেলে খুব রেগে যায়, তখন সাথে সাথে কিছু না বলে আগে ওকে শান্ত হওয়ার সুযোগ দিই। অনেক সময় শুধু পাশে বসে থাকি। কারণ ট্যানট্রাম (Tantrum)-এর সময় শিশুর যুক্তি দিয়ে বোঝার ক্ষমতা কম থাকে।
একটা জিনিস আমি খেয়াল করেছি, অনেক রাগের পেছনে আসলে বেসিক কারণ থাকে।
যেমন:
•    ঘুম কম হওয়া 
•    অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম 
•    ক্ষুধা 
•    অতিরিক্ত উদ্দীপনা
•    মনোযোগ না পাওয়া 
•    রুটিন পরিবর্তন হওয়া
আমার ছেলে যদি দুপুরে ঠিকমতো না ঘুমায়, তাহলে বিকেল থেকেই তার খিটখিটে ভাব বেড়ে যায়। আগে এটা বুঝতাম না। এখন ঘুমের রুটিন একটু মেইনটেইন (Maintain) করার চেষ্টা করি।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমারেখা নির্ধারণ।
অনেক বাবা-মা ভাবেন, রাগ না করার জন্য সবকিছু মেনে নিতে হবে। কিন্তু শিশুর সুস্থ আবেগগত বিকাশ (healthy emotional development)-এর জন্য পরিষ্কার সীমারেখা (clear boundary) খুব জরুরি। যেমন, আমি এখন কিছু বিষয়ে কনসিস্টেন্ট (Consistent) থাকার চেষ্টা করি।
যদি বলি “আজ আর চকলেট না”, তাহলে কান্না করলেও সিদ্ধান্ত বদলাই না। কারণ বারবার নিয়ম পরিবর্তন করলে শিশুর কনফিউশন (Confusion) বাড়ে। তবে “না” বলার ভঙ্গিটাও গুরুত্বপূর্ণ।
আগে বলতাম:
“চুপ! হবে না!”
এখন বলি:
“আমি জানি তুমি চকলেট চাও। কিন্তু আজকে আর না।”
এতে শিশুর আবেগকে স্বীকার করা হয়, যদিও সিদ্ধান্ত একই থাকে।
আরেকটা জিনিস আমি নিজে ফলো করি—ভালো আচরণ পর্যবেক্ষণ করা।
আমরা অনেক সময় শুধু খারাপ আচরণে প্রতিক্রিয়া দেখাই। কিন্তু শিশু শান্তভাবে খেললে বা সুন্দরভাবে কিছু করলে সেটা বলাও জরুরি।
যেমন:
“তুমি আজ খেলনা গুছিয়েছো, এটা খুব ভালো হয়েছে।”
পজিটিভ অ্যাটেনশন (Positive Attention) শিশুর আচরণ ভালো করতে বৈজ্ঞানিকভাবে অনেক সাহায্য করে।
আমার স্বামীও এখন একটা জিনিস ফলো করে, বাসায় ফিরে অন্তত কিছু সময় পুরো মনযোগ দিয়ে ছেলের সাথে খেলে। কারণ আমি বুঝেছি, অনেক সময় শিশুর জেদ আসলে কানেকশন এর চাহিদাও হতে পারে।
তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সব রাগ “স্বাভাবিক” ধরে নেওয়াও ঠিক না। যদি শিশুর জেদ ও কান্নাকাটি খুব বেশি হয়, নিজেকে আঘাত করে, কথা কমে যায়, বা আচরণ হঠাৎ খুব বদলে যায়, তাহলে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিজ্ঞানী -এর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আমি এখনো নিখুঁত মা না। এখনো অনেক দিন ধৈর্য হারাই। কিন্তু একটা জিনিস শিখেছি, ৩ বছরের শিশুর রাগ মানে খারাপ শিশু না। এটা তার বিকাশমান মস্তিষ্ক -এর একটা অংশ।
এই বয়সে শিশুর সবচেয়ে বেশি দরকার ভয় না, নিরাপদ অনুভূতি। কারণ ধীরে ধীরে শান্ত হতে শেখাটাও আসলে বাবা-মায়ের কাছ থেকেই শুরু হয়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000