
নতুন বাবা হওয়ার পর আমি একটা বিষয় বুঝতে পারলাম যে সন্তান জন্মের সাথে সাথে বাবা-মায়ের ভয়ও জন্ম নেয়। “পড়ে যাবে না তো?”, “অসুস্থ হবে না তো?”, “কাঁদছে কেন?”, “এটা ধরলে সমস্যা হবে না তো?” এই চিন্তাগুলো খুব স্বাভাবিক। বিশেষ করে যৌথ পরিবারে সবাই যখন শিশুকে নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকে, তখন অনেক সময় না বুঝেই সন্তান...
নতুন বাবা হওয়ার পর আমি একটা বিষয় বুঝতে পারলাম যে সন্তান জন্মের সাথে সাথে বাবা-মায়ের ভয়ও জন্ম নেয়। “পড়ে যাবে না তো?”, “অসুস্থ হবে না তো?”, “কাঁদছে কেন?”, “এটা ধরলে সমস্যা হবে না তো?” এই চিন্তাগুলো খুব স্বাভাবিক।
বিশেষ করে যৌথ পরিবারে সবাই যখন শিশুকে নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকে, তখন অনেক সময় না বুঝেই সন্তান পালন একটু বেশি সুরক্ষামূলক হয়ে যায়। আমরাও প্রথমদিকে ছেলেদের নিয়ে এতটাই সতর্ক ছিলাম যে, কেউ কোলে নিলেও দুশ্চিন্তা হতো। কিন্তু পরে সন্তান পালন নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বুঝলাম, অতিরিক্ত সুরক্ষা কখনো কখনো শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক সন্তান পালন (Overprotective Parenting) বা হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং বলা হয়। এক্ষেত্রে বাবা-মা শিশুর প্রতিটি কাজ, সিদ্ধান্ত বা চ্যালেঞ্জ এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করেন যে শিশু নিজের মতো অনুসন্ধান করা বা সমস্যার সমাধান করার সুযোগ কম পায়।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সুরক্ষামূলক হওয়া আর অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক হওয়া এক জিনিস নয়।
শিশুকে নিরাপদ রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু যদি প্রতিটি ছোট ঝুঁকি, অস্বস্তি বা ব্যর্থতা থেকেও তাকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখা হয়, তাহলে শিশু ধীরে ধীরে নিজের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস কম অনুভব করতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক সন্তান পালন অনেক ক্ষেত্রে শিশুর আত্মদক্ষতা বা “আমি নিজে পারি” এই অনুভূতি কমিয়ে দিতে পারে।
একটা শিশু আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে কীভাবে?
শুধু প্রশংসা শুনে নয়। বরং ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, ভুল করে, আবার চেষ্টা করে। যখন শিশু নিজের চেষ্টায় কিছু করতে শেখে, তখন তার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নিজের সক্ষমতার অনুভূতি তৈরি করে। কিন্তু অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক সন্তান পালনে অনেক সময় বাবা-মা অজান্তেই সব বাধা আগেই সরিয়ে দেন।
যেমনঃ
● শিশু নিজে খেতে চাইলে “নোংরা করবে” বলে থামিয়ে দেওয়া
● খেলতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই টেনে ধরা
● সবসময় সিদ্ধান্ত বাবা-মা নিয়ে দেওয়া
● শিশুকে নিজের হয়ে কথা বলতে না দেওয়া
● সবসময় “তুমি পারবে না” ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া
এসব আচরণ ভালোবাসা থেকেই আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিশুর আত্মবিশ্বাসের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক সন্তান পালন শিশুদের আত্মবিশ্বাস এবং স্বনির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উদ্বেগ। যদি শিশু বারবার দেখে পৃথিবীকে সবসময় “বিপজ্জনক” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাহলে সে ধীরে ধীরে নিজেও চারপাশের পরিবেশকে অনিরাপদ ভাবতে শুরু করতে পারে। কিছু গবেষণায় বাবা-মায়ের অতিরিক্ত সুরক্ষা এবং শিশুর উদ্বেগের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
আমি নিজের পরিবারেও এটা লক্ষ্য করি। বড়রা অনেক সময় ভালোবেসে বলেন, “ওকে একা ছাড়ো না”, “ওটা ধরতে দিও না”, “ও নিজে পারবে না।” এগুলো উদ্বেগ থেকেই বলা হয়। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে বুঝেছি, নিয়ন্ত্রিত স্বনির্ভরতা শিশুর বিকাশের জন্য খুবই দরকারি।
যেমন এখন আমরা বাচ্চাদের নিরাপদ পরিবেশের মধ্যে একটু স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিই। সবসময় বাধা না দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি। কারণ নতুন কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এটাও সত্যি, আধুনিক সন্তান পালনের ধারণায় মাঝে মাঝে “স্বনির্ভরতা” শব্দটা ভুলভাবে ব্যবহার হয়। ছোট শিশুকে পুরোপুরি নিজের মতো ছেড়ে দেওয়াও স্বাস্থ্যকর সন্তান পালন নয়।
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি হলো সমর্থনমূলক সন্তান পালন, যেখানে শিশুকে বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতাও দেওয়া হয়। অর্থাৎ, শিশুকে মানসিক সমর্থন দেওয়া হবে, আবার বয়স উপযোগী স্বাধীনতাও দেওয়া হবে।
উদাহরণ হিসেবে-
● শিশু চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য না করে একটু সময় দেওয়া
● ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিজে নিতে দেওয়া
● ব্যর্থ হলে লজ্জা না দিয়ে উৎসাহ দেওয়া
● নিরাপদ সীমার মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া
এসব পদ্ধতি শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
আমার মনে হয়, অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক সন্তান পালনের সবচেয়ে জটিল দিক হলো, বাইরে থেকে এটা খুব যত্নশীল আচরণ বলে মনে হয়। কারণ দেখে মনে হয় বাবা-মা শিশুর প্রতি অনেক মনোযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু সবসময় অতিরিক্ত সুরক্ষা পেলে শিশু নিজের সক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ কম পায়।
সবশেষে আমি বলবো, শিশুকে আত্মবিশ্বাস শেখানো যায় না, আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়।
একটি শিশু তখনই নিজের উপর বিশ্বাস করতে শেখে, যখন সে অনুভব করে, “আমার পাশে মানুষ আছে, কিন্তু আমার হয়ে সবকিছু তারা করে দেবে না।"
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন