
গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিকভাবে সহায়ক যৌথ পারিবারিক পরিবেশ শিশুর মধ্যে পরিবারের অংশ হওয়ার অনুভূতি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বৃহত্তর পরিবারের সহায়তার মধ্যে বড় হয়, তারা অনেক সময় বেশি...
আমাদের দেশে যৌথ পরিবার এখনো অনেক পরিবারের বাস্তবতা। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা-ফুপু বা খালা-মামাদের উপস্থিতি শিশুর বেড়ে ওঠায় একটা বিস্তার ভূমিকা রাখে। একটি শিশু শুধু মা-বাবার কাছ থেকেই না, পুরো পরিবারের পরিবেশ থেকেই নিজের পরিচয় বা Identity গঠন করতে শুরু করে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় identity development বলতে বোঝায়, একটি শিশু ধীরে ধীরে “আমি কে?”, “আমি কেমন?”, “আমার ঠিকানা কী?” এই ধারণাগুলো তৈরি করা। এই প্রক্রিয়া জন্মের পর থেকেই শুরু হয় এবং পরিবার সেখানে সবচেয়ে বড় প্রভাবক।
যৌথ পরিবারে শিশুর Identity Development এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নানা ধরনের Emotional Interaction।
একটি শিশু যখন একসাথে অনেক মানুষের সাথে বড় হয়, তখন সে বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগের ধরন এবং সম্পর্কের ভিন্ন ভিন্ন রূপ সম্পর্কে জানতে শেখে। যেমন, দাদার সাথে তার মেলামেশা একরকম, মায়ের সাথে আরেকরকম, আবার বড় ভাই বা ফুপুর সাথে ভিন্ন ধরনের। এই বৈচিত্র্যময় সম্পর্কগুলো শিশুর সামাজিক বোধ এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বিকাশে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিকভাবে সহায়ক যৌথ পারিবারিক পরিবেশ শিশুর মধ্যে পরিবারের অংশ হওয়ার অনুভূতি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বৃহত্তর পরিবারের সহায়তার মধ্যে বড় হয়, তারা অনেক সময় বেশি মানসিক নিরাপত্তা অনুভব করে। কারণ তাদের জীবনে একাধিক ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মানুষের উপস্থিতি থাকে, যাদের ওপর তারা ভরসা করতে পারে।
আমার ছেলেরা এখনো ছোট, কিন্তু ইতোমধ্যেই তারা বিভিন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর, স্পর্শ এবং প্রতিক্রিয়া আলাদা করে চিনতে শিখছে। এই বারবার যোগাযোগ ও একসাথে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাগুলো শিশুর মস্তিষ্কে সামাজিক সম্পর্ক বোঝার ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে।
তবে যৌথ পরিবার কি সবসময় শুধু ইতিবাচক প্রভাব ফেলে? বিষয়টি এতটা সরল নয়। একটি সাধারণ সমস্যা হলো শিশুর স্বতন্ত্রতা কিছুটা চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। অনেক যৌথ পরিবারে শিশুকে খুব ছোটবেলা থেকেই পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী আচরণ করতে শেখানো হয়। এতে শৃঙ্খলা শেখা অবশ্যই ভালো বিষয়, কিন্তু কখনো কখনো শিশুর নিজস্ব পছন্দ, অনুভূতি বা মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব নাও পেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো শিশু যদি স্বভাবগতভাবে শান্ত হয়, তাহলে তাকে “লাজুক” বলে চিহ্নিত করা হয়। আবার কোনো শিশু বেশি চঞ্চল হলে তাকে “দুষ্ট” বলা হয়। মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি শিশুকে বারবার একই পরিচয়ে চিহ্নিত করা তার নিজের সম্পর্কে ধারণার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, ধীরে ধীরে সে নিজেকেও ঠিক সেই পরিচয়েই দেখতে শুরু করতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো Comparison Culture।
যৌথ পরিবারে কাজিনদের সঙ্গে তুলনা করা বেশ সাধারণ একটি বিষয়। “ওর মতো হও”, “ও কত শান্ত”, “ও কত ভালো পড়ে”- এই ধরনের কথাগুলো অনেক সময় অজান্তেই শিশুর আত্মমর্যাদাবোধের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার নেতিবাচক তুলনা শিশুর উদ্বেগ এবং নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়ার অনুভূতি বাড়াতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যৌথ পরিবার ক্ষতিকর। বরং একটি সুস্থ যৌথ পারিবারিক পরিবেশ শিশুর আত্মপরিচয়ের বিকাশের জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ হতে পারে যদি সেখানে তার স্বতন্ত্রতাকে সম্মান করা হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি শিশুকে শুধু “পরিবারের সন্তান” হিসেবে নয়, বরং একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবেও দেখা।
যেমনঃ
● তার আলাদা মেজাজ থাকতে পারে
● আলাদা পছন্দ থাকতে পারে
● আলাদা ভয় বা কৌতুহল থাকতে পারে
এই নিজস্বতা কে গুরুত্ব দেয়া খুব জরুরি।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো সাংস্কৃতিক পরিচয়।
যৌথ পরিবারে শিশুরা সাধারণত পারিবারিক গল্প, আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও সম্পর্কের মূল্যবোধের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত হতে পারে। দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছ থেকে পারিবারিক ইতিহাস শোনা কিংবা একসঙ্গে উৎসব পালন করা শিশুর মধ্যে আপনত্ববোধ তৈরি করতে সাহায্য করে।
বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, শক্তিশালী পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধ শিশুর মানসিক দৃঢ়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কারণ এতে শিশু অনুভব করে, “আমি একটি বড় পরিবারের অংশ।”
তবে ব্যক্তিগত সীমারেখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যদি শিশুর প্রতিটি সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, লজ্জা দেওয়া বা সমালোচনা থাকে, তাহলে তার আত্মপরিচয়ের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তখন শিশু নিজের পছন্দের চেয়ে অন্যদের স্বীকৃতি পাওয়ার দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে যেতে পারে।
তাই আধুনিক অভিভাবকত্ব এবং যৌথ পারিবারিক সংস্কৃতির মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন।
আমার নিজের অভিজ্ঞতায় আমি বুঝেছি, যৌথ পরিবারে শিশুর আত্মপরিচয় অনেক স্তরের প্রভাবের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। এখানে ভালোবাসা আছে, প্রভাব আছে, দিকনির্দেশনা আছে, আবার চাপও থাকতে পারে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুকে এমন একটি পরিবেশ দেওয়া, যেখানে সে একই সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত এবং গৃহীত অনুভব করে। কারণ একটি শিশু তখনই সুস্থ আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে পারে, যখন সে বুঝতে শেখে, “আমি পরিবারের অংশ, কিন্তু আমি আলাদা একজন মানুষও।”
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন