লোগো

মায়ের মানসিক চাপ কি গর্ভের শিশুও অনুভব করে?

মায়ের মানসিক চাপ কি গর্ভের শিশুও অনুভব করে?

শাহ আলমের স্ত্রী এখন চার মাসের গর্ভবতী। কিন্তু এই সময়টাতে তার জীবনে খুব বেশি বিশ্রাম নেই। সকালে অন্যের বাসায় কাজ করতে যাওয়া, বাসায় ফিরে রান্না, তিন বছরের ছেলে রাফিকে সামলানো, সব মিলিয়ে শরীরের পাশাপাশি মনও প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার উপর আছে টাকার চিন্তা। নতুন বাচ্চা আসবে, খরচ বাড়বে, চিকিৎসা লাগবে, এসব ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে সে চুপচাপ হয়ে যায়। রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয় না। একদিন পাশের বাসার এক আপা তাকে বলছিলেন, “গর্ভাবস্থায় বেশি টেনশন নিও না, বাচ্চার উপর প্রভাব পড়ে।” কথাটা শুনে শাহ আলমের স্ত্রী ভয় পেয়ে যায়। সে ভাবতে থাকে, “তাহলে কি আমি চিন্তা করলেই বাচ্চার ক্ষতি হবে?”

আসলে বিষয়টা একটু বুঝে জানা দরকার।
বিজ্ঞান বলছে, গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক অবস্থা অনাগত শিশুর উপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তার মানে এই না যে মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা হলেই বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। হালকা উদ্বেগ গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক অংশ। সমস্যা হয় যখন দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভয়, অশান্তি বা অবসাদ চলতে থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যখন একজন মানুষ খুব বেশি চিন্তার মধ্যে থাকে, তখন শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline) এর মতো স্ট্রেস হরমোন বাড়তে পারে। গর্ভবতী মায়ের শরীরেও এই পরিবর্তন হয়। দীর্ঘসময় অতিরিক্ত স্ট্রেস থাকলে এই হরমোনগুলোর কিছু প্রভাব গর্ভের শিশুর উপরও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সাথে কিছু ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যেমটরে
•    সময়ের আগে সন্তান জন্ম 
•    কম ওজন নিয়ে জন্মানো 
•    জন্মের পর শিশুর অতিরিক্ত অস্থিরতা 
•    ভবিষ্যতে ইমোশনাল রেগুলেশন -এর কিছু সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা 
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো “সম্ভাব্য ঝুঁকি”। মানে স্ট্রেস হলেই এমন হবেই, তা না।
অনেক মা এই ধরনের তথ্য শুনে আরও ভয় পেয়ে যান। কিন্তু ভয় বা অপরাধবোধ বাড়ানো আসলে সমস্যাকে আরও বাড়াতে পারে।
শাহ আলমের স্ত্রীও আগে ভাবত, “আমি যদি দুশ্চিন্তা করি তাহলে আমি খারাপ মা।” পরে স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মী তাকে বোঝান, গর্ভাবস্থায় আবেগ ওঠানামা করা খুব স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের যত্ন নেয়ার চেষ্টা করা এবং একা না থাকা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইমোশনাল সাপোর্ট গর্ভবতী মায়েদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, পরিবারের সহযোগিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
শাহ আলম আগে বুঝত না তার স্ত্রীর মনের চাপ কতটা। এখন সে চেষ্টা করে বাসায় ফিরে একটু সময় দিতে। কখনো রাফিকে নিয়ে বাইরে হাঁটতে যায় যাতে তার স্ত্রী বিশ্রাম পায়। কখনো শুধু পাশে বসে কথা শোনে।
এই ছোট ছোট জিনিসও অনেক বড় মানসিক সাপোর্ট হতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্ট্রেস পুরোপুরি দূর করা সবসময় সম্ভব না, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারে। সংসারের বাস্তব চাপ থাকবেই। কিন্তু কিছু ছোট অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। যেমনঃ
•    পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া 
•    কারো সাথে নিজের চিন্তা শেয়ার করা 
•    হালকা হাঁটাহাঁটি করা 
•    পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা 
•    পরিবারে অকারণ ঝগড়া কমানো 
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের ইমোশনাল ওয়েলবিইং শুধু মায়ের জন্য না, পুরো পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মা শান্ত থাকলে শিশুর যত্ন নেয়াও সহজ হয়।
শাহ আলম এখন বুঝতে শুরু করেছে, গর্ভবতী স্ত্রীকে শুধু খাবার এনে দিলেই দায়িত্ব শেষ না। তার মানসিক স্বস্তিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটা অনাগত শিশু জন্মের আগেই তার চারপাশের পরিবেশের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করে। তাই গর্ভাবস্থায় মায়ের পাশে থাকা, তাকে নিরাপদ অনুভব করানো, আর পরিবারের ভেতরে একটু শান্ত পরিবেশ তৈরি করা; এগুলো শুধু আবেগের বিষয় না, বরং শিশুর সুস্থ বিকাশেরও অংশ।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000