
“বাচ্চাকে একটু ভয় না দেখালে বা বকা না দিলে সে কখনো কথা শুনবে না” – এরকমটা মনে করেন অধিকাংশ বাবা মা-ই. তাদের ভেতরে একটা জিনিস কাজ করে, “আমরা নিজেরাও তো এমন পরিবেশেই বড় হয়েছি।"
“চুপ করো”, “এটা করো না”, “আরেকবার করলে মারবো” - এই ধরনের কথা কিন্তু আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু মা হওয়ার পর, বিশেষ করে আমার ছেলে যখন দুই-তিন বছরের দিকে গেল, তখন বুঝলাম বকা দিয়ে সবসময় বিহেভিয়ার নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, সেটা দীর্ঘমেয়াদী কোন সমাধান না।
আমার ছেলে এখন তিন বছরের। এই বয়সে ওর কৌতুহল যেমন বেশি, তেমনি অনুভুতিও খুব প্রখর।
আগে আমি যত বেশি রেগে যেতাম, ও তত বেশি চিৎকার করত। অনেক সময় মনে হতো যেন ক্ষমতার লড়াই চলছে।
পরে আমি শিশুদের ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। তখন বুঝলাম, শৃঙ্খলা আর শাস্তি এক জিনিস না।
শৃঙ্খলা শব্দটার মূল অর্থই হলো “শেখানো”।
বিজ্ঞান অনুযায়ী, ছোট শিশুদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিকশিত থাকে না। বিশেষ করে তাৎক্ষণিক আবেগ বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ, নিজের অনুভূতি সামলানো এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয়গুলো মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ নামের অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা পুরোপুরি বিকশিত হতে অনেক বছর সময় লাগে।
তাই তিন বছরের একটি শিশু অনেক সময় বুঝতেই পারে না কীভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
তাই আমার ছেলে কোন কিছু ছুড়ে ফেলে দিলে আমি calm থাকার চেষ্টা করি।
যেমন আমি বলিঃ
“আমি বুঝতে পারছি তুমি রেগে গেছো। কিন্তু জিনিস ছোড়া safe না।”
এতে শিশুর Emotion Acknowledge করা হয়, কিন্তু Boundary-ও clear থাকে।
রিসার্চ বলছে, যখন বাবা-মা শান্ত থাকেন কিন্তু নিয়মের ব্যাপারে দৃঢ় থাকেন, তখন শিশুরা ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
আরেকটা বড় ভুল আমি আগে করতাম—শুধু খারাপ আচরণগুলোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিতাম।
এখন আমি ইচ্ছা করেই শিশুর ভালো আচরণগুলো লক্ষ্য করি এবং প্রশংসা করি।
যেমন:
“তুমি আজ খেলনাগুলো গুছিয়ে রেখেছো, এতে তোমার রুম দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।”
শিশুর ভালো আচরণকে এভাবে ইতিবাচকভাবে উৎসাহ দেওয়া খুব কার্যকর একটি পদ্ধতি। কারণ এতে শিশু বুঝতে শেখে কোন আচরণগুলো প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য।
আরেকটা বিষয় আমার খুব কাজে এসেছে, আগে থেকেই শিশুকে প্রস্তুত করা। কারণ ছোট শিশুরা হঠাৎ করে পরিবর্তন খুব ভালোভাবে নিতে পারে না। যেমনঃ
আগে আমি হঠাৎ বলতাম, “মোবাইল বন্ধ। এখন ঘুমাতে যাও।”
তারপর শুরু হয়ে যেত বড় ধরনের কান্না বা রাগারাগি।
কিন্তু এখন আমি কিছুক্ষন আগে থেকে রিমাইন্ডার দেই,
“আর পাঁচ মিনিট পরে আমরা মোবাইল বন্ধ করব।”
এতে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পায়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমি প্যারেন্টিং এক্সপার্ট-দের কাছ থেকে শিখেছি, “Correction-এর আগে Connection।”
অর্থাৎ, শিশুর সাথে মানসিক সংযোগ তৈরি না করে শুধু নিয়ম চাপিয়ে দিলে অনেক সময় তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে।
আমি এখন খেয়াল করি, যেদিন আমার ছেলে আমার কাছ থেকে কম মনোযোগ পায়, সেদিন তার আচরণগত সমস্যাও বেশি দেখা যায়।
তাই প্রতিদিন ছোট ছোট সময় বের করে তার সাথে সুন্দর কিছু মুহূর্ত কাটানোর চেষ্টা করি। যেমনঃ
● একসাথে বই পড়া
● পাঁচ মিনিট খেলাধুলা
● গল্প করা
● জড়িয়ে ধরা
এগুলো শিশুর ইমোশনাল সিকিউরিটি বাড়ায়।
অনেকেই ভাবেন “জেন্টেল প্যারেন্টিং” মানে শিশুকে যা খুশি করতে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে সন্তানকে সুস্থভাবে শাসনের জন্য ক্লিয়ার বাউন্ডারি থাকা খুবই জরুরি।
যেমন:
● অন্যের সাথে মারামারি করা যাবে না
● বিপজ্জনক জিনিস হাতে নেওয়া যাবে না
● সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে
তবে এই নিয়মগুলো মানানোর সময় শিশুকে অপমান করা বা ভয় দেখানো উচিৎ নয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। যেমনঃ কোনকিছু যদি আমরা “না” করি, ছেলে যতই কান্নাকাটি করুক না কেন আমরা নিয়ম পরিবর্তন করি না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো বাবা-মাই সবসময় শান্ত থাকতে পারেন না। বাবা-মা ভুল করলে সেটা স্বীকার করে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করাও শিশুর জন্য ভালো উদাহরণ তৈরি করে।
কারণ শিশুর সবসময় নিখুঁত বাবা-মা দরকার হয় না, বরং দরকার এমন বাবা-মা, যাদের কাছে সে মানসিকভাবে নিরাপদ অনুভব করে।
তাছড়া, ভয় দেখিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু সম্মান ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে শেখানো শৃঙ্খলা শিশুকে দীর্ঘমেয়াদে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বেশি সাহায্য করে।
শিশু শুধু আমাদের কথা থেকেই নয়, আমাদের আচরণ থেকেও শেখে। তাই অনেক সময় শান্তভাবে বলা একটি কথার প্রভাব, বকা দিয়ে বলা কথার থেকেও বেশি হতে পারে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন