
শাহ আলমের ছেলে রাফির বয়স এখন তিন বছর। ছোট্ট একটা ঘরে তাদের সংসার, কিন্তু কাজের যেন শেষ নেই। রাফির মা গর্ভবতী হওয়ায় এখন আগের চেয়ে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়। একদিন রান্না করার সময় হঠাৎ তার হাত থেকে চামচ পড়ে যায়। তখন ছোট্ট রাফি দৌড়ে গিয়ে চামচটা তুলে দেয়। ঘটনাটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু শাহ আলম চুপচাপ সেটা দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, শিশুকে ছোটবেলা থেকেই যদি অন্যকে সাহায্য করতে শেখানো যায়, তাহলে সেটাই হয়তো তার চরিত্রের বড় শক্তি হয়ে দাঁড়াবে।
অনেক বাবা-মা মনে করেন অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা বড় হলে আসে। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সহানুভূতি, সহযোগিতা আর যত্নশীল আচরণ-এর ভিত্তি ছোটবেলাতেই তৈরি হতে শুরু করে। বিশেষ করে ২–৫ বছরের শিশুরা আশেপাশের মানুষের আচরণ দেখে ধীরে ধীরে শিখতে থাকে কোন আচরণ “ভালো” এবং কোন আচরণ অন্যকে স্বস্তি দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট শিশুদের মধ্যে অন্যকে সাহায্য করার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে। যেমনঃ কেউ কিছু ফেললে তুলে দিতে চাওয়া, কাঁদলে কাছে আসা, বা বড়দের কাজ নকল করার চেষ্টা করা। তাই এই সময়টা তাদের সাহায্য করার মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
শাহ আলম আগে ভাবত, “এত ছোট বাচ্চা আবার কী সাহায্য করবে?” তাই রাফি কিছু করতে গেলেই বলত, “থাক, তুমি পারবা না।”
কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে, শিশুকে ছোট ছোট দায়িত্ব দেয়া আসলে তার আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ দুটোই বাড়ায়।
এখন রাফি মাঝে মাঝে নিজের খেলনা গুছিয়ে রাখে, মায়ের জন্য পানির বোতল এনে দেয়, বা বাজারের ছোট ব্যাগ ধরে হাঁটে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই ধরনের ছোট দায়িত্ব শিশুর মধ্যে সহযোগিতার দক্ষতা ও সহমর্মিতা তৈরি করতে সাহায্য করে। যখন একটা শিশু বুঝতে শেখে যে তার কাজ অন্য কারো উপকার করছে, তখন তার ভেতরে সামাজিক সংযোগের অনুভূতি বাড়ে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব শিশুকে ছোটবেলা থেকে বয়স অনুযায়ী ছোট দায়িত্ব দেয়া হয়, তারা ভবিষ্যতে তুলনামূলক বেশি আত্মনির্ভর ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল হতে পারে।
তবে সাহায্য করার মানসিকতা শেখানোর সময় একটা ভুল অনেক বাবা-মা করেন। তারা সাহায্যকে শুধু “কাজ” হিসেবে দেখান।
যেমনঃ
“এটা না করলে মারবো”
“ভালো বাচ্চা হলে কাজ করো”
এই ধরনের চাপ শিশুর মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাহায্য করার মানসিকতা শেখানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বড়রা নিজেরা সাহায্য করার আচরণ দেখানো।
শাহ আলম এখন চেষ্টা করে রাফির সামনে মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতে। পাশের বৃদ্ধ মানুষটার ব্যাগ ধরতে সাহায্য করলে রাফিও সেটা দেখে। শিশুরা বড়দের আচরণ খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। মনোবিজ্ঞানে একে observational learning বলা হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর সাহায্যের চেষ্টাকে মূল্য দেয়া।
রাফি যখন পানি এনে দেয়, তখন অর্ধেক পানি পড়ে যায়। আগে শাহ আলম বিরক্ত হতো। এখন সে বলে, “তুমি সাহায্য করতে চাইছো, এটা ভালো।” এতে রাফির ভেতরে সাহায্য করার আগ্রহ আরও বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক উৎসাহ শিশুর সহযোগিতামূলক ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে সে অন্যকে সাহায্য করতে ও উপকার করতে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সাহায্য করার মানসিকতা শুধু পরিবারের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। এটা শিশুকে ভবিষ্যতে সহানুভূতিশীল মানুষ হতেও সাহায্য করে।
যখন একটা শিশু দেখে তার মা অসুস্থ, আর সে পাশে বসে পানি দিচ্ছে, তখন সে যত্নশীল আচরণ শিখছে। যখন সে ছোট ভাইবোনকে খেলনা দেয়, তখন সে শেয়ারিং শিখছে। এই ছোট ছোট আচরণই ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, সন্তানের জন্য শুধু ভালো স্কুল বা ভালো খাবারই যথেষ্ট না। মানুষ হিসেবে বড় হওয়ার শিক্ষা ঘরের ভেতর থেকেই শুরু হয়। হয়তো তাদের সংসারে অনেক অভাব আছে। কিন্তু যদি রাফি বড় হয়ে মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখে, সাহায্য করতে শেখে, সম্মান করতে শেখে, তাহলে সেটাও বড় অর্জন।
কারণ সাহায্য করার মানসিকতা আসলে শুধু একটা অভ্যাস না, এটা একজন মানুষের মানবিকতার ভিত্তি।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন