
প্রশ্নঃ আমার মেয়ের বয়স ৪ বছর, ওর আর কোনো ভাইবোন নেই। বাইরে কোথাও গেলে সবাই কোলে নিতে চায় বা আদর করতে আসে। কিন্তু ও কাউকে কাছে আসতে দিতে চায় না, জোরে কাঁদতে শুরু করে। অনেকেই বলে, আমি নাকি ওকে বেশি আগলে রাখি। সত্যিই কি তাই, নাকি এটা স্বাভাবিক?
৪ বছর বয়সী শিশু বাইরে কোথাও গেলে অন্য কেউ কোলে নিতে চাইলে বা আদর করতে এলে কাঁদতে শুরু করলে মা-বাবার অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের সমাজে শিশুকে আদর করা, কোলে নেওয়া, গালে হাত দেওয়াকে খুব স্বাভাবিক মনে করা হয়। তাই শিশু যদি এসব না চায়, অনেকেই বলে বসেন, “মা বেশি আগলে রেখেছে”, “শিশু খুব ভীতু হয়ে গেছে” কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি শিশুর স্বভাব, আরামবোধ এবং মানুষের সঙ্গে মেশার গতি আলাদা।
৪ বছর বয়সে অনেক শিশু নিজের শরীর, নিজের পছন্দ-অপছন্দ এবং নিরাপদ-অনিরাপদ অনুভূতি ভালোভাবে বুঝতে শুরু করে। কেউ তাকে হঠাৎ কোলে নিতে চাইলে, গায়ে হাত দিলে বা খুব কাছে এলে সে অস্বস্তি বোধ করতে পারে। এটা সবসময় খারাপ লক্ষণ নয়। বরং শিশুর নিজের সীমা বোঝার একটি স্বাভাবিক অংশও হতে পারে।
এ অবস্থায় প্রথমেই শিশুকে জোর করা উচিত নয়। “আন্টির কোলে যাও”, “একটু আদর করতে দাও”, “কাঁদছ কেন?”, এভাবে চাপ দিলে শিশুর ভয় আরও বাড়তে পারে। সে বুঝতে পারে, তার অস্বস্তির কোনো মূল্য নেই। বরং মা-বাবা যদি তার পাশে দাঁড়ান, তাহলে সে নিরাপদ অনুভব করে। যেমন বলা যায়, “ও এখন কোলে যেতে চাইছে না, আপনি চাইলে ওকে দূর থেকে হাই বলতে পারেন।” এতে আত্মীয়ের সম্মানও থাকে, আবার শিশুর সীমাও রক্ষা হয়।
শিশুকে শেখানো যায়, সে চাইলে “না” বলতে পারে। তবে “না” বলার ভদ্র উপায়ও শেখানো দরকার। যেমনঃ হাত নেড়ে সালাম দেওয়া, হাসি দেওয়া, “আমি এখন কোলে যাব না” বলা, বা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। এতে শিশুর সামাজিক আচরণও শেখা হয়, আবার তাকে নিজের শরীরের ওপর অধিকারও দেওয়া হয়।
পরিবারের বড়দেরও নরমভাবে বোঝানো দরকার। সরাসরি “ওকে ধরবেন না” বললে কেউ কষ্ট পেতে পারেন। তার বদলে বলা যায়, “ও একটু সময় নিয়ে মিশে। আগে দূর থেকে কথা বললে ও স্বস্তিবোধ করে” এই বাক্যটি শিশুকে লাজুক বা সমস্যা হিসেবে দেখায় না, বরং তার গতি বোঝায়।
তবে শিশুকে সবসময় মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখাও ঠিক নয়। ধীরে ধীরে নিরাপদ সামাজিক অভ্যাস তৈরি করতে হবে। যেমন, পরিচিত আত্মীয়দের সঙ্গে ছোট সময়ের দেখা, আগে থেকে শিশুকে জানানো “আজ খালা আসবে”, অথবা বাসায় রোল প্লে করা, যেমন “কেউ সালাম দিলে তুমি কী করবে?” এসব অনুশীলন তাকে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী করে।
মা-বাবার আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু যদি দেখে মা-বাবা শান্তভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, তাহলে সে মডেল পায়। কিন্তু তাকে জোর করে সামাজিক বানানোর চেষ্টা করলে উল্টো সে আরও সরে যেতে পারে।
তবে যদি শিশু শুধু কোলে যেতে না চাওয়া নয়, প্রায় সব মানুষের কাছেই খুব ভয় পায়, খেলাধুলা এড়িয়ে চলে, কথা বলতে চায় না, বাইরে গেলেই অতিরিক্ত আতঙ্কিত হয়, বা এই আচরণ দিন দিন বাড়তে থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবশেষে, শিশুকে আগলে রাখা আর শিশুর সীমারেখাকে সম্মান করা এক বিষয় নয়। মা-বাবার কাজ হলো তাকে নিরাপদ অনুভব করানো, ভদ্রভাবে “না” বলতে শেখানো এবং ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মেশার সাহস তৈরি করা। শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে তখনই, যখন সে জানে যে তার কথা মা-বাবা শুনছেন।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন