
প্রশ্নঃ আমার দুই মেয়ে। বড়টার বয়স ১০ বছর, ছোটটার ৭ বছর। বড় মেয়েটা এখন প্রায়ই বলে, "আমি মোটা হয়ে গেছি", "আমি সুন্দর না।" এসব কথা শুনে খুব খারাপ লাগে। এত ছোট বয়সে নিজের চেহারা নিয়ে এমন চিন্তা কেন করছে? আমি কীভাবে ওর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারি?
১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে যদি বারবার বলে, “আমি মোটা হয়ে গেছি” বা “আমি সুন্দর না”, তাহলে মা-বাবার মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। এত ছোট বয়সে নিজের চেহারা নিয়ে এমন চিন্তা শুনলে ভয় লাগে। তবে প্রথমেই বুঝতে হবে, এই কথাগুলোকে হালকা করে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। আবার আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখালেও শিশু আরও অস্বস্তিতে পড়ে যেতে পারে।
এই বয়সে শিশুরা নিজের শরীর, চেহারা, পোশাক, বন্ধুদের মন্তব্য নিয়ে বেশি সচেতন হতে শুরু করে। স্কুল, আত্মীয়, বন্ধু, বড়দের কথা, টিভি-ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়ার ছবি তার মনে “সুন্দর মানে কেমন”, “মোটা মানে খারাপ কি না”, এ ধরনের ধারণা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় কেউ মজা করে কিছু বললেও শিশু সেটাকে খুব গভীরভাবে নেয়।
এ অবস্থায় প্রথম কাজ হলো তার কথা মন দিয়ে শোনা। সে “আমি সুন্দর না” বললে সঙ্গে সঙ্গে শুধু “না না, তুমি খুব সুন্দর” বললে কিছুটা সান্ত্বনা মিললেও মূল অনুভূতিটা অজানা থেকে যায়। বরং শান্তভাবে জিজ্ঞেস করা যায়, “তোমার এমন মনে হলো কেন?” বা “কেউ কিছু বলেছে?” এতে সে নিজের ভেতরের কথাগুলো বলতে সুযোগ পায়।
দ্বিতীয়ত, শরীর নিয়ে পরিবারের ভাষা বদলানো জরুরি। শিশুর সামনে নিজের বা অন্যের শরীর নিয়ে “মোটা”, “কালো”, “খাটো”, “বেশি শুকনা”, এ ধরনের মন্তব্য না করাই ভালো। এমনকি মজা করেও বলা উচিত নয়। শিশুরা বড়দের কথা খুব দ্রুত ধরে ফেলে। মা যদি বারবার বলেন, “আমি মোটা হয়ে গেছি”, “আমাকে দেখতে খারাপ লাগছে”, তাহলে মেয়েও নিজের শরীরকে একইভাবে বিচার করতে শিখতে পারে।
তৃতীয়ত, শিশুর প্রশংসা শুধু চেহারা দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। “তুমি সুন্দর” বলার পাশাপাশি বলুন, “তুমি খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করো”, “তুমি ভাইয়ের প্রতি যত্নশীল”, “তোমার আঁকার আইডিয়াটা দারুণ”, “তুমি চেষ্টা করেছ, এটা খুব ভালো।” এতে সে বুঝবে, তার মূল্য শুধু মুখ, রং, ওজন বা পোশাকে নয়।
চতুর্থত, খাবার ও শরীর নিয়ে বার্তা হবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক, চেহারাকেন্দ্রিক নয়। “মোটা হয়ে যাবে, এটা খেও না” এর বদলে বলা যায়, “শরীর শক্ত রাখতে আমরা পুষ্টিকর খাবার খাই।” “ওজন কমাতে হাঁটো” এর বদলে “খেলাধুলা করলে শরীর ভালো থাকে, মনও ভালো থাকে।” এই ছোট ভাষার পরিবর্তন শিশুর শরীর নিয়ে ভয় কমাতে সাহায্য করে।
পঞ্চমত, মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে কথা বলা দরকার। বয়স অনুযায়ী তাকে বোঝানো যায়, ছবিতে অনেক সময় ফিল্টার, সাজ, আলো বা এডিট থাকে এবং সব ছবি বাস্তব নয়। তাছাড়া সুন্দর হওয়ার কোনো মাপ নেই কারণ মানুষের শরীর, রং, গঠন আলাদা আলাদা, আর সেটাই স্বাভাবিক।
ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা করাও এড়িয়ে চলুন। “তোমার ভাই তো এত ভাবে না”, এ ধরনের কথা তাকে আরও একা অনুভব করাতে পারে। বরং তার সঙ্গে আলাদা সময় কাটান, যেন সে নিরাপদে নিজের কথা বলতে পারে।
যদি সে বারবার নিজের শরীর নিয়ে খুব কষ্ট পায়, খাওয়া কমিয়ে দেয়, আয়নার সামনে অতিরিক্ত সময় কাটায়, স্কুলে যেতে না চায়, বা নিজেকে খুব খারাপ বলে, তাহলে শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবশেষে মনে রাখবেন, মেয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে শুধু “তুমি সুন্দর” বলা যথেষ্ট নয়। তাকে শেখাতে হবে তার শরীর সম্মানের, তার চেষ্টা মূল্যবান, আর তার পরিচয় চেহারার চেয়ে অনেক বড়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন