লোগো

শিশুর ছোট ছোট মিথ্যা: বকাঝকা না করে সত্য বলার অভ্যাস কীভাবে গড়বেন

শিশুর ছোট ছোট মিথ্যা: বকাঝকা না করে সত্য বলার অভ্যাস কীভাবে গড়বেন

প্রশ্নঃ আমার মেয়ের বয়স ৯ বছর, ওর ছোট একটা ভাই আছে। কয়েক দিন ধরে দেখছি, ছোট ছোট বিষয়েও মিথ্যা বলছে। ধরাও পড়ছে, তারপরও আবার একই কাজ করছে। আমরা কি কোথাও ভুল করছি? বকাঝকা না করে কীভাবে এই অভ্যাসটা ঠিক করা যায়?

৯ বছর বয়সী শিশু ছোট ছোট বিষয়ে মিথ্যা বললে বাবা-মায়ের চিন্তা হওয়া খুব স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন সে ধরা পড়ার পরও আবার একই কাজ করে, তখন মনে হতেই পারে, “আমরা কি কোথাও ভুল করছি?” তবে প্রথমেই মনে রাখা দরকার, শিশুর মিথ্যা বলা মানেই সে খারাপ হয়ে যাচ্ছে এমন নয়। অনেক সময় মিথ্যার পেছনে থাকে ভয়, লজ্জা, শাস্তি এড়ানোর চেষ্টা, মনোযোগ পাওয়ার ইচ্ছা বা নিজের ভুল ঢেকে রাখার প্রবণতা।
এই বয়সে শিশুরা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য অনেকটাই বুঝতে শেখে। তাই মিথ্যা বললে সেটাকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু আতঙ্কিত হয়ে নয়। অনেক সময় শিশু ভাবে, “সত্য বললে বকা খাব”, “মা-বাবা রেগে যাবে”, বা “আমি খারাপ প্রমাণ হয়ে যাব” তখন সে সত্য বলার বদলে মিথ্যা বলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। তাই প্রথম কাজ হলো ঘরে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সত্য বললে শিশুর ভয় কমে।
শিশুকে সরাসরি “তুমি মিথ্যাবাদী” বলা ঠিক নয়। এতে সে নিজের আচরণ বদলানোর বদলে নিজের পরিচয়টাই খারাপ ভাবতে শুরু করতে পারে। বরং বলা যায়, “তুমি যে কথাটা বললে, সেটা ঠিক মেলেনি। আমি চাই তুমি সত্যিটা বলো, তাহলে আমরা একসঙ্গে সমাধান করব।” এই ধরনের বাক্য শিশুকে আক্রমণ করে না, কিন্তু সত্য বলার গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, মিথ্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। সে কি শাস্তি এড়াতে মিথ্যা বলছে? পড়া শেষ করেনি কিন্তু বলছে সে শেষ করেছে? ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে দোষ লুকাচ্ছে? কারণটা না বুঝে শুধু বকলে মূল সমস্যাটা থেকে যায়। শান্তভাবে জিজ্ঞেস করা যায়, “তুমি কি ভয় পেয়েছিলে সত্য বললে আমি রাগ করব?” এতে শিশু ধীরে ধীরে নিজের ভয়ের কথা বলতে শিখে।
তৃতীয়ত, সত্য বললে প্রশংসা করুন, এমনকি ভুল করলেও। যেমন, “তুমি সত্যি বলেছ, এটা খুব ভালো। ভুলটা আমরা ঠিক করব।” এতে শিশু বুঝবে, সত্য বলা নিরাপদ। তবে সত্য বললেই সব ফলাফল মুছে যাবে না। যদি সে কিছু ভেঙে থাকে, তাহলে তাকে ঠিক করতে সাহায্য করতে হবে। যদি পড়া না করে মিথ্যা বলে থাকে, তাহলে পরে পড়া শেষ করতে হবে। কিন্তু শাস্তি যেন অপমান বা ভয় দেখানোর মতো না হয়; বরং দায়িত্ব শেখানোর মতো হয়।
চতুর্থত, বাবা-মাকেও নিজের আচরণ খেয়াল করতে হবে। শিশুর সামনে যদি বড়রা ছোট মিথ্যা বলে, যেমন “ফোনে বলো আমি বাসায় নেই”, তাহলে সে বুঝে যায়, সুবিধা হলে মিথ্যা বলা চলে। শিশুরা কথার চেয়ে আচরণ বেশি শেখে।
পঞ্চমত, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা করবেন না। “তোমার ভাই তো মিথ্যা বলে না”, এ ধরনের কথা ঈর্ষা, রাগ ও আত্মরক্ষার প্রবণতা বাড়াতে পারে। বরং তাকে আলাদাভাবে বোঝান, পরিবারে বিশ্বাস কত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি মিথ্যা বলা খুব ঘন ঘন হয়, চুরি, মারামারি, স্কুলের সমস্যা বা অতিরিক্ত ভয়-চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
মূল কথা হলো, মিথ্যা কমানোর সবচেয়ে ভালো পথ হলো ভয় কমানো, সত্য বলার সাহস বাড়ানো এবং ভুলের দায়িত্ব নিতে শেখানো। বকাঝকা সাময়িকভাবে শিশুকে চুপ করাতে পারে, কিন্তু নিরাপদ সম্পর্কই তাকে সত্য বলার অভ্যাস শেখায়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...