লোগো

দাদির আদর আর মায়ের দুশ্চিন্তা: শিশুর খাবার ও মোবাইল অভ্যাস কীভাবে সামলাবেন?

দাদির আদর আর মায়ের দুশ্চিন্তা: শিশুর খাবার ও মোবাইল অভ্যাস কীভাবে সামলাবেন?

প্রশ্ন: আমি একজন চাকরিজীবী মা। আমার ছেলে ১ বছর ৬ মাসের, ওর আর কোনো ভাইবোন নেই। অফিসে যাওয়ার সময় ওকে ওর দাদির কাছে রেখে যাই। সমস্যা হলো, দাদি ওকে খুব আদর করে প্রায়ই চিপস, চকলেট দেন, আবার খাওয়ানোর সময় মোবাইলে কার্টুনও চালিয়ে দেন। আমি এগুলো একদমই চাই না, কিন্তু কিছু বললে উনি কষ্ট পান। এমন অবস্থায় কী করলে সবাইকে সম্মান রেখেও বিষয়টা সামলানো যায়?

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে চাকরিজীবী মায়েদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো সন্তানটা নিরাপদ কারো হাতে আছে এটা জানা। অফিসে যাওয়ার সময় ১ বছর ৬ মাসের শিশুকে দাদির কাছে রেখে যাওয়া অনেক মায়ের জন্য আশীর্বাদের মতো। কারণ দাদি শুধু দেখাশোনা করেন না, ভালোবাসা দেন, সময় দেন, সঙ্গ দেন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ভালোবাসার প্রকাশটা শিশুর স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সঙ্গে মিলে না। যেমনঃ বারবার চিপস, চকলেট দেওয়া বা খাওয়ানোর সময় মোবাইলে কার্টুন চালিয়ে দেওয়া।
এই অবস্থায় প্রথমেই মনে রাখা দরকার, দাদির উদ্দেশ্য খারাপ নয়। তিনি শিশুকে খুশি করতে চান। তাই সরাসরি “আপনি ভুল করছেন” বললে তিনি কষ্ট পেতে পারেন। আবার মা চুপ থাকলেও শিশুর অভ্যাস ধীরে ধীরে খারাপ দিকে যেতে পারে। তাই এখানে দরকার বুদ্ধি, ধৈর্য আর সম্মানজনক কথা বলা।
প্রথম ধাপ হলো অভিযোগ না করে অনুভূতি দিয়ে কথা বলা। যেমন, “মা, আপনি ওকে এত যত্ন করেন বলে আমি অফিসে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি। কিন্তু ডাক্তার বলেছে, এই বয়সে বেশি চিপস-চকলেট আর খাওয়ার সময় মোবাইল বাচ্চাদের সামনে দেয়া ভালো না। তাই আমরা একটু অন্যভাবে চেষ্টা করি?” এই ধরনের বাক্যে সম্মান থাকে, আবার বার্তাটাও পরিষ্কার হয়।
দ্বিতীয়ত, শুধু নিষেধ করলে হবে না; বিকল্প দিতে হবে। কারণ দাদি যদি শিশুকে খুশি করার জন্য কিছু দিতে চান, তাহলে তাঁর হাতে ভালো অপশন থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ঘরে ছোট ছোট বক্সে রাখা যায় বিভিন্ন নরম ফল যেমনঃ কলা, আম ইত্যাদি, সেদ্ধ ডিমের ছোট টুকরা, ঘরে বানানো খিচুড়ি, টকদই, বা শিশুর বয়স অনুযায়ী নিরাপদ স্ন্যাকস। দাদিকে বলা যায়, “চকলেটের বদলে এগুলো দিলে ওর পেটও ভরবে, শরীরও ভালো থাকবে।” এতে তিনি নিজেকে বাদ পড়া মানুষ মনে করবেন না, বরং শিশুর ভালো অভ্যাস গড়ার অংশ মনে করবেন।
তৃতীয়ত, খাওয়ানোর সময় মোবাইলের বদলে ছোট গল্প, ছড়া, পুতুল, চামচের খেলা বা জানালার বাইরে কিছু দেখানোর অভ্যাস করা যায়। শুরুতে শিশু কান্না করতে পারে, কারণ সে পুরোনো অভ্যাস চাইবে। কিন্তু সবাই একই নিয়ম মানলে কয়েক দিন পর ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলাবে। সবচেয়ে জরুরি হলো মা এক কথা বললেন, দাদি আরেক নিয়ম চালালেন; এমন হলে শিশু বিভ্রান্ত হয়।
চতুর্থত, নিয়মগুলো খুব কঠিন না করে ছোট করে লিখে রাখা যায়। যেমন: “খাওয়ার সময় মোবাইল নয়, “আগে ভাত/খিচুড়ি/ফল, পরে অন্য কিছু।” এগুলো আদেশের মতো না বলে “আমাদের বাসার নিয়ম” হিসেবে বলা ভালো।
আরেকটি ভালো উপায় হলো শিশুর বাবাকে আলোচনায় যুক্ত করা। মা একা বললে অনেক সময় বিষয়টা “বউমার আপত্তি” মনে হতে পারে। কিন্তু ছেলে যদি নিজের মাকে সুন্দরভাবে বলে, “মা, আমরা চাই ওর দাঁত, পেট আর খাওয়ার অভ্যাস ভালো থাকুক”, তাহলে দাদি বিষয়টা সহজে নিতে পারেন।
সবশেষে, দাদিকে ধন্যবাদ দেওয়া খুব জরুরি। কারণ তিনি শিশুর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। নিয়ম মানলে তাঁকে বলুন, “আপনি না থাকলে আমি এত শান্তিতে অফিস করতে পারতাম না।” এই স্বীকৃতি সম্পর্ককে আরো সুন্দর রাখে।
শিশুর ভালো অভ্যাস গড়তে পরিবারের সবার সহযোগিতা লাগে। দাদির ভালোবাসা থাকবে, মায়ের নিয়মও থাকব; শুধু প্রয়োজন সম্মানজনক যোগাযোগ। এতে শিশুও নিরাপদ থাকবে, সম্পর্কও সুন্দর থাকবে।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...