
আমাদের দেশে এখনো অনেক পরিবারে খুব সাধারণ একটা ধারণা হলো নবজাতক শিশু মানেই “মায়ের দায়িত্ব”। বাবা মূলত বাইরে কাজ করবে, উপার্জন করবে, আর শিশুর আসল যত্ন নেবে মা ও পরিবারের অন্য নারীরা। যমজ ছেলে হওয়ার আগে আমিও অনেকটা এমনটাই ভাবতাম। মনে হতো, এত ছোট বাচ্চার সাথে “শেখানো” আবার কী!
কিন্তু সন্তান হওয়ার পর ধীরে ধীরে বুঝলাম, নবজাতকের শেখা আসলে বই-পড়া বা এ বি সি শেখানো না। জন্মের পর থেকেই শিশুর মস্তিষ্ক চারপাশের পৃথিবী দেখে শেখা শুরু করে। আর এই শেখার বড় অংশ আসে পারস্পরিক যোগাযোগ থেকে, বিশেষ করে মা-বাবার কণ্ঠ, মুখ, স্পর্শ এবং সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে।
গবেষণা অনুযায়ী, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর মস্তিষ্ক সবচেয়ে দ্রুত বিকাশ লাভ করে। হার্ভার্ড সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড-এর ভাষায়, প্রাথমিক পর্যায়ের যোগাযোগ এবং সাড়া-দেওয়া যত্ন (রেসপনসিভ কেয়ারগিভিং) শিশুর মস্তিষ্কের গঠন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একজন বাবা নবজাতককে শেখানোতে যুক্ত হতে চাইলে সবচেয়ে আগে যেটা বোঝা দরকার, সেটা হলো, “শেখানো” মানে সবসময় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না। শিশুর জন্য শেখা শুরু হয় দৈনন্দিন যোগাযোগ থেকেই।
আমি শুরুতে বুঝতেই পারিনি, বাচ্চারা আসলে কতটা পর্যবেক্ষণ করে। এখন আমি বাসায় ফিরলে ছেলেরা আমার কণ্ঠ শুনে প্রতিক্রিয়া দেয়, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিশু বিকাশ বিষয়ক গবেষণা বলছে, নবজাতকেরা জন্মের পর থেকেই মানুষের মুখ এবং কণ্ঠের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
সবচেয়ে সহজ কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী অংশগ্রহণ হলো, শিশুর সাথে কথা বলা।
অনেক বাবা ভাবেন, “এত ছোট বাচ্চা তো কিছু বুঝে না।” কিন্তু বাস্তবে শিশুর ভাষা শেখার নেটওয়ার্ক খুব ছোট বয়স থেকেই তৈরি হতে শুরু করে। যখন বাবা শিশুর সাথে কথা বলেন, গল্প বলেন, গান গাইেন বা সহজ শব্দ বারবার বলেন, তখন শিশুর মস্তিষ্ক ভাষার প্যাটার্ন প্রক্রিয়া করতে শুরু করে।
আমি এখন অনেক সময় খুব সাধারণ জিনিসও বলি,
“এটা আলো।”
“বৃষ্টি হচ্ছে।”
“বাবা এসেছে।”
এগুলো হয়তো এখন পুরো অর্থ বুঝছে না, কিন্তু এই পুনরাবৃত্ত যোগাযোগ ভবিষ্যতের যোগাযোগ দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করছে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চোখে চোখে যোগাযোগ এবং মুখভঙ্গি।
নবজাতকের শেখার বড় অংশ সামাজিক শেখা। যখন বাবা শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসেন, প্রতিক্রিয়া দেন, মুখভঙ্গি পরিবর্তন করেন, তখন শিশু সামাজিক সংকেত (সোশ্যাল কিউ) বুঝতে শেখে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় “সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন” ইন্টারঅ্যাকশন। অর্থাৎ শিশু কোনো সংকেত দিল, আর মা-বাবা সেই অনুযায়ী সাড়া দিলেন। এই পারস্পরিক আদান-প্রদান মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু খেলাধুলা না, দৈনন্দিন যত্নও শেখার অংশ।
যেমনঃ
● ডায়াপার পরিবর্তনের সময় কথা বলা
● খাওয়ানোর সময় কোলে নিয়ে শান্তভাবে কথা বলা
● লালন-গীতি শোনানো
● পেটের উপর শুইয়ে (টামি টাইম) উৎসাহ দেওয়া
এসব কার্যক্রম সংবেদনশীল বিকাশ এবং আবেগীয় বন্ধন, দুই দিকেই সাহায্য করে।
আমাদের যৌথ পরিবারে শুরুতে অনেকে বলতেন, “বাবার এত ইনভলভমেন্টের দরকার কী?” কারণ আগের প্রজন্মে বাবার অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু এখন গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায়, যেসব শিশু বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ পায়, তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ভাষা বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে ভালো হয়।
তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারফেকশন দরকার নেই।
অনেক বাবা দোষবোধ করেন যে তারা ব্যস্ত। আমিও ব্যবসার কারণে সবসময় পাশে থাকতে পারি না। কিন্তু পরে বুঝেছি, নবজাতকের শেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিক উপস্থিতি। প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিট মনোযোগ দিয়ে সময় দিলেও, সেটা শিশুর জন্য খুব অর্থবহ হতে পারে।
সবশেষে আমি একটা বিষয় খুব গভীরভাবে বুঝেছি, নবজাতকের শেখা কোনো ব্যয়বহুল খেলনা বা জটিল কার্যক্রম দিয়ে শুরু হয় না। এটা শুরু হয় মা-বাবার কণ্ঠ, স্পর্শ, হাসি এবং উপস্থিতি দিয়ে। একটি শিশু তখনই সবচেয়ে ভালো শেখে, যখন সে অনুভব করে, “আমার দিকে কেউ মন দিয়ে তাকাচ্ছে, আমার সাথে কথা বলছে, আমি গুরুত্বপূর্ণ।”
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন