লোগো

সপ্তাহে একদিনের পারিবারিক ঘোরাঘুরি: সন্তানের জন্য অমূল্য উপহার

সপ্তাহে একদিনের পারিবারিক ঘোরাঘুরি: সন্তানের জন্য অমূল্য উপহার

শাহ আলম সপ্তাহে ছয় দিন রাস্তার পাশে বসে জুতা মেরামতের কাজ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ, তারপর সংসারের হিসাব, বাজারের চিন্তা, বাড়িভাড়া, ওষুধ, সব মিলিয়ে জীবনটা যেন প্রতিদিন একই ছন্দে আটকে আছে। তার স্ত্রীও অন্যের বাসায় কাজ করেন। এখন তিনি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তাই আগের মতো সবকিছু সামলাতে গিয়ে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিন বছরের ছেলে রাফি বেশিরভাগ সময় ছোট্ট ঘরের ভেতরেই খেলাধুলা করে।

এক শুক্রবার বিকেলে কাজ একটু আগে শেষ হয়েছিল। রাফি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। সে বারবার বলছিল, “আব্বু, বাইরে যাই।” শাহ আলম প্রথমে ভাবল, বাইরে গেলে হয়তো আইসক্রিম চাইবে, খেলনা চাইবে, অযথা খরচ হবে। কিন্তু স্ত্রী হেসে বললেন, “শুধু একটু হাঁটলেই তো হয়।”
সেদিন তারা তিনজন মিলে পাশের মাঠে গেল। রাফি ঘাসের উপর দৌড়াতে লাগল, একটা প্রজাপতির পেছনে ছুটল, কয়েকটা কাক দেখে গুনতে চেষ্টা করল। শাহ আলম তাকে গাছ দেখিয়ে বলল, “এটা আমগাছ, আর ওটা কাঁঠালগাছ।” রাফি মন দিয়ে শুনছিল।
বাড়ি ফিরে শাহ আলম একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করল। রাফি সেদিন মোবাইল চায়নি, নিজের খেলনা নিয়ে খেলেছে, খাওয়াও ভালো করেছে এবং রাতে খুব শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টা কোনো দামি রেস্টুরেন্ট, বিনোদন পার্ক বা শপিং মলে কাটাতে হবে এমন নয়। বরং কাছের মাঠ, পার্ক, নদীর পাড় কিংবা গাছপালার নিচে কিছুক্ষণ হাঁটাও শিশুর জন্য সমান উপকারী হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা শিশুদের মধ্যে মনোযোগ, কৌতূহল এবং সৃজনশীল চিন্তা বিকাশের সুযোগ বাড়ে। খোলা আকাশ, বাতাস, পাখির ডাক, মাটির গন্ধ এসব শিশুর ইন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে এবং নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
শুধু তাই নয়, বাইরে হাঁটার সময় শিশুর সঙ্গে কথা বলাও তার ভাষা বিকাশে সাহায্য করে। শাহ আলম এখন রাফিকে জিজ্ঞেস করে, “আজ কতগুলো ফুল দেখলে?”, “বলটা কোন রঙের?”, “ওই মানুষটা কী করছে?” রাফি নিজের মতো করে উত্তর দেয়। এই সাধারণ কথোপকথনই তার শব্দভাণ্ডার ও চিন্তাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, ছোট শিশুদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত শারীরিক নড়াচড়া ও সক্রিয় খেলাধুলার সুযোগ থাকা উচিত। খোলা জায়গায় দৌড়ানো, বল নিয়ে খেলা বা হাঁটাহাঁটি শিশুর হাড়, পেশি ও ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতা উন্নত করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে শারীরিক কার্যকলাপ ভালো ঘুম ও ইতিবাচক মেজাজের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এই ছোট্ট আউটিং শুধু রাফির জন্য নয়, তার মায়ের জন্যও স্বস্তির সময় হয়ে উঠেছে। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা হাঁটাহাঁটি ও শান্ত পরিবেশে সময় কাটানো অনেক নারীর মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। সারাদিন কাজের পর কিছুক্ষণ পরিবারের সঙ্গে বসে থাকা বা সন্তানের হাসিমুখ দেখা তার মনকেও হালকা করে দেয়।
শাহ আলম আগে ভাবত, ভালো বাবা হতে হলে অনেক টাকা থাকতে হয়। এখন সে বুঝতে শিখেছে, সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দামি খেলনা নয়, বরং বাবা-মায়ের সময় ও মনোযোগ। মাঠে বসে বল খেলা দেখা, পাখি গোনা, মেঘের আকার নিয়ে গল্প করা কিংবা গাছের পাতা ছুঁয়ে দেখা,  এগুলোই শিশুর কাছে অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে তৈরি হওয়া ইতিবাচক স্মৃতিগুলো শিশুর নিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাস এবং পারিবারিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। এই স্মৃতিগুলো তৈরি করতে বড় বাজেটের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু কিছুটা সময় এবং একসঙ্গে থাকার ইচ্ছা।
এখন প্রতি শুক্রবার বিকেল হলেই রাফি জুতা পরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। সে জানে, আজ হয়তো কোনো নতুন খেলনা পাওয়া যাবে না, কিন্তু আব্বুর হাত ধরে মাঠে হাঁটা হবে, পাখি দেখা হবে, গাছ চেনা হবে, আর পরিবারের সবাই একসাথে হাসবে।
সংগ্রামের জীবনে এমন ছোট্ট অভ্যাসগুলোই হয়তো সবচেয়ে বড় আনন্দ এনে দেয়। সপ্তাহে একদিন পরিবারের সঙ্গে একটু ঘুরতে যাওয়া শুধু বিনোদন নয়; এটি শিশুর শারীরিক বিকাশ, মানসিক সুস্থতা, ভাষা শেখা, পারিবারিক বন্ধন এবং সুন্দর শৈশব গড়ে তোলার একটি সহজ, বিজ্ঞানসম্মত এবং সবার নাগালের উপায়।

 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000