লোগো

নবজাতক ও টডলারকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে মায়ের মানসিক অবসাদ

নবজাতক ও টডলারকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে মায়ের মানসিক অবসাদ

আগে আমি ভাবতাম, বাচ্চার যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। কিন্তু দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর বুঝলাম, বাস্তবতা আসলে অনেক বেশি জটিল। আমার ছোট মেয়েটার বয়স এখন তিন মাস। আর বড় ছেলেটা তিন বছরের। একদিকে নবজাতক শিশুর সারাক্ষণের যত্ন, অন্যদিকে টলমল পায়ে হাঁটা আর দুষ্টুমিতে ভরা একটা ছোট বাচ্চা, দুজনকে একসাথে সামলানো যে কতটা কঠিন হতে পারে, সেটা না হলে বোঝানো মুশকিল। অনেকেই বলে, “তুমি তো বাসায় থাকো, তোমার আবার এত ক্লান্তি কিসের?” কিন্তু বাসায় থাকা আর সারাদিন বিশ্রাম করা যে এক জিনিস নয়, সেটা এখন আমি খুব ভালো বুঝি।

আমার স্বামী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যবসার কাজে বাইরে থাকে। সংসার আর বাচ্চাদের বেশিরভাগ দায়িত্ব আমার ওপরই থাকে। স্বামীর ছোট বোন আমাদের সঙ্গে থাকে, কিন্তু সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়াশোনা আর ক্লাসের ফাঁকে যতটুকু পারে সাহায্য করে, কিন্তু পুরো দায়িত্ব তো আর তার ওপর দেওয়া যায় না।
শুরুর দিকে আমি বুঝতেই পারিনি যে ধীরে ধীরে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি।
রাতে ছোট মেয়েটা বারবার ঘুম থেকে উঠত। কখনো দুধ খাওয়াতে হতো, কখনো কোলে নিয়ে শান্ত করতে হতো। রাত শেষ হতে না হতেই সকাল হয়ে যেত। তারপর আবার বড় ছেলের নাস্তা, ঘরের কাজ, রান্নাবান্না, খেলনা গুছানো, কান্না থামানো! সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত লাগত মানসিকভাবে।
একজন কোলে উঠতে চাইছে, আরেকজনের ডায়াপার বদলাতে হবে। একজন ঘুমিয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই আরেকজন কান্না শুরু করেছে। দিনের শেষে মনে হতো, আমি যেন শুধু কোনোভাবে দিনটা পার করছি।
একসময় খেয়াল করলাম, খুব সহজেই রেগে যাচ্ছি। ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্ত লাগছে। কখনো আবার হঠাৎ কান্না পেয়ে যাচ্ছে। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। এমনও হয়েছে, নিজের কাছেই প্রশ্ন করেছি, “আমি কি খারাপ মা হয়ে যাচ্ছি?”
পরে বিভিন্ন লেখা পড়তে গিয়ে বুঝলাম, এমন অনুভূতি শুধু আমার না। অনেক মা-ই সন্তান জন্মের পর এই ধরনের মানসিক ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যান। বিশেষ করে যখন নবজাতকের যত্ন, ঘুমের অভাব, শারীরিক পরিবর্তন আর বড় সন্তানের চাহিদা, সব একসাথে সামলাতে হয়, তখন মানসিক চাপ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
তখন আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখলাম, সবসময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে না। আগে মনে হতো বাসা সবসময় ঝকঝকে থাকতে হবে। সব রান্না নিজের হাতে করতে হবে। বাচ্চারা একবার কাঁদলেই সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক করতে হবে। এখন বুঝি, এই সময়টাতে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সবাইকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখা। তাই ধীরে ধীরে নিজের প্রত্যাশাগুলো একটু কমালাম। আগে ঘর একটু এলোমেলো থাকলে অস্থির লাগত। এখন ভাবি, ছোট বাচ্চা থাকলে এটা স্বাভাবিক।
আরেকটা বড় পরিবর্তন হলো সাহায্য গ্রহণ করা। আগে কেউ সাহায্য করতে চাইলে মনে হতো, সবকিছু আমারই করা উচিত। এখন বুঝেছি, সাহায্য নেওয়া দুর্বলতা নয়। আমার ননদ যখন বলে, “ভাবি, বাচ্চাটাকে একটু দিন, আমি রাখি,” তখন চেষ্টা করি সেই সুযোগটা নিতে। কখনো একটু চুপচাপ বসি, কখনো এক কাপ চা খাই।
আমার স্বামীও ধীরে ধীরে বিষয়টা বুঝেছে। এখন বাসায় ফিরে অন্তত কিছু সময় বড় ছেলের সঙ্গে কাটায় বা ছোট মেয়েটাকে কোলে নেয়, যাতে আমি একটু নিজের মতো থাকতে পারি।
সত্যি বলতে, একজন মায়ের জন্য টানা ১৫–২০ মিনিট নিরিবিলি সময়ও অনেক বড় স্বস্তি হতে পারে।
আরেকটা বিষয় আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে শিখেছি, নতুন শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে বড় সন্তানের অনুভূতি ভুলে গেলে চলে না। মেয়েটা জন্মানোর পর আমার ছেলে আগের চেয়ে অনেক বেশি আমার কাছে থাকতে চাইত। প্রথমে ভাবতাম, ও শুধু আদর চাইছে। পরে বুঝলাম, নতুন ভাইবোন আসার পর অনেক শিশুই নিজেকে একটু অনিরাপদ মনে করতে পারে। তাই এখন চেষ্টা করি প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শুধু ওর জন্য রাখতে। কখনো গল্প করি, কখনো ছবি আঁকি, কখনো শুধু ওর কথা শুনি।
নিজের জন্যও ছোট ছোট কিছু অভ্যাস রাখার চেষ্টা করি।
• একটু হাঁটা
• শান্তভাবে এক কাপ চা খাওয়া
• কাছের কারও সঙ্গে কথা বলা
• সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছু সময় দূরে থাকা
• বাচ্চা ঘুমালে সুযোগ পেলে নিজেও একটু বিশ্রাম নেওয়া
আমি এখনো সবকিছু খুব সুন্দরভাবে সামলাতে পারি না। এখনো কিছু দিন খুব কঠিন যায়। এখনো এমন দিন আসে, যখন মনে হয় আর পারছি না।
তবে একটা জিনিস শিখেছি, সবসময় ক্লান্ত লাগা বা মাঝে মাঝে ভেঙে পড়া মানে আপনি খারাপ মা নন। বরং অনেক সময় এটা প্রমাণ করে যে আপনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি দায়িত্ব একা বহন করে যাচ্ছেন।
আমরা সাধারণত শুধু শিশুর যত্নের কথা বলি। কিন্তু যে মানুষটা সারাদিন সেই শিশুর যত্ন নিচ্ছে, তারও যত্ন প্রয়োজন। কারণ একজন মা যদি সম্পূর্ণ ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে তাকেও ভালোবাসা, বিশ্রাম আর সহযোগিতা দরকার। আর সেটাও পরিবারের সবার দায়িত্ব।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000