লোগো

বাবার ব্যস্ততা কি বাবা-সন্তানের সম্পর্ককে দুর্বল করে?

বাবার ব্যস্ততা কি বাবা-সন্তানের সম্পর্ককে দুর্বল করে?

ব্যবসার কারণে আমার দিনের বেশিরভাগ সময়ই বাসার বাইরে কাটে। সকালে বের হওয়ার সময় দুই ছেলেকে ঘুমিয়ে রেখে যাই, আর অনেক দিন রাতে ফিরতে ফিরতে ওদের ঘুমানোর সময় হয়ে যায়। যেহেতু ওরা এখনো খুব ছোট, তাই শুরুতে আমার মনে প্রায়ই একটা প্রশ্ন আসত, আমি কি ওদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো মিস করে ফেলছি?

আমার শাশুড়ি একদিন বলেছিলেন, “ছোটবেলায় বাচ্চারা মায়ের সাথেই বেশি থাকে, বাবার সাথে সম্পর্ক পরে গড়ে ওঠে।” কথাটার মধ্যে কিছুটা সত্যতা থাকলেও, বাবা হওয়ার পর আমি ধীরে ধীরে অন্য একটা বিষয় বুঝেছি। সন্তানের সাথে সম্পর্ক শুধু কত ঘণ্টা পাশে থাকলাম, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই সময়টুকু কেমন কাটালাম, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুরা জীবনের প্রথম কয়েক বছরে যাদের কাছ থেকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর সাড়া পায়, তাদের সাথেই গভীর মানসিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। আর এই জায়গায় বাবার ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার সাথে নিয়মিত ইতিবাচক যোগাযোগ শিশুর আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
তাই ব্যস্ত বাবা হওয়া মানেই সন্তানের সাথে দূরত্ব তৈরি হবে, বিষয়টা এমন নয়।
আমি নিজেও একটা সময় ভুল করতাম। বাসায় ফিরেও ফোনে কাজের মেসেজ দেখতাম, ব্যবসার চিন্তা মাথায় ঘুরত। ছেলেরা কোলে আসতে চাইত, কিন্তু আমি পুরো মনোযোগ দিতে পারতাম না। একদিন আমার স্ত্রী বলল, “ওরা তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে, তুমি খেয়ালই করো না।”
কথাটা আমাকে ভাবিয়েছিল।
এরপর থেকে একটা ছোট পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি। বাসায় ফিরে অন্তত কিছু সময় শুধু ওদের জন্য রাখি। ফোন দূরে রাখি, কোলে নিই, কথা বলি, মুখভঙ্গি করি, হাসি। ওরা হয়তো এখনো আমার কথা বুঝে না, কিন্তু আমার মুখ, কণ্ঠস্বর আর উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।
এই বয়সে শিশুরা চোখের দিকে তাকানো, হাসির জবাব দেওয়া, পরিচিত কণ্ঠস্বর চিনে নেওয়ার মতো বিষয় থেকেই অনেক কিছু শেখে। বাবা-মায়ের সাথে এমন ছোট ছোট মুহূর্তই তাদের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে সাহায্য করে।
আরেকটা বিষয় আমি পরে বুঝেছি, বন্ডিং শুধু খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না।
কান্না করলে কোলে নেওয়া, ঘুম পাড়ানো, ডায়াপার বদলানো, কিংবা কয়েক মিনিট পাশে বসে থাকা, এসবের মধ্যেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমাদের সমাজে অনেক সময় এসব কাজ শুধু মায়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আমি যখন নিজে এসব কাজে অংশ নিই, তখন ছেলেদের সাথে এক ধরনের আলাদা সংযোগ অনুভব করি।
জয়েন্ট ফ্যামিলি-তে আরেকটা বাস্তবতা আছে। অনেকেই মনে করেন, বাবার প্রধান দায়িত্ব হলো উপার্জন করা। সন্তানের যত্নের বিষয়গুলো মায়ের ওপরই বেশি থাকে। আমি সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে দোষ দিই না, কারণ আগের প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছিল। তবে এখন আমরা জানি, একজন মানসিকভাবে যুক্ত বাবা শিশুর সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
অবশ্যই সবদিন এক রকম যায় না। ব্যবসার চাপ থাকে, ক্লান্তি থাকে, কখনো সময়ও কম পাওয়া যায়। তাই এখন আমি নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করি না। বরং নিয়মিত ছোট ছোট মুহূর্ত তৈরি করার চেষ্টা করি।
কারণ আমি বুঝেছি, প্রতিদিনের কয়েক মিনিটের আন্তরিক সময়ও অনেক মূল্যবান হতে পারে।
আজকাল বাসায় ফিরলে দুই ছেলে আমাকে দেখেই হাত-পা নাড়ে, হাসে, কখনো উত্তেজিত হয়ে শব্দ করে। তখন মনে হয়, সম্পর্ক গড়ে ওঠে শুধু সময়ের হিসাব দিয়ে নয়; গড়ে ওঠে মনোযোগ, উপস্থিতি আর ভালোবাসা দিয়ে।
আর বাবা হিসেবে হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000