লোগো

ভদ্র ও সম্মানজনক ভাষা শেখানো শিশুর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভদ্র ও সম্মানজনক ভাষা শেখানো শিশুর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শাহ আলম একদিন দোকানে বসে কাজ করছিল। তার তিন বছরের ছেলে রাফিও পাশে খেলছিল। হঠাৎ রাফি রেগে গিয়ে আরেকটা বাচ্চাকে এমন একটা কথা বলে ফেলল, যেটা শুনে শাহ আলম চমকে ওঠে। কারণ কথাটা সে নিজেই কয়েকদিন আগে রাগের মাথায় বলেছিল। সেদিন প্রথমবার সে বুঝতে পারে, শিশুরা শুধু কথা শোনে না, তারা কথার ধরনও শিখে ফেলে।

অনেক বাবা-মা ভাবেন ভদ্র ভাষা শেখানো মানে শুধু “সালাম দাও”, “ধন্যবাদ বলো” শেখানো। কিন্তু বিষয়টা এর চেয়ে অনেক বড়। ছোটবেলায় শিশুর ভাষার ধরন তার সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পর্ক তৈরির উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, একটা শিশু কীভাবে কথা বলতে শিখছে, সেটা তার ব্যক্তিত্ব গঠনের অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুরা মূলত অনুকরণের মাধ্যমে ভাষা শেখে। তারা আশেপাশের বড়দের কথা, রাগের ধরন, সম্মান দেখানোর পদ্ধতি, সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। তাই শুধু শিশুকে “ভদ্রভাবে কথা বলো” বললে হবে না, পরিবারের বড়দেরও সেটা নিজের আচরণে দেখাতে হবে।
শাহ আলম আগে কাজের চাপ বা টাকার টেনশনে বাসায় এসে অনেক সময় রাগী গলায় কথা বলত। কখনো “চুপ থাকো”, “বিরক্ত করো না”, এসব কথাও বের হয়ে যেত। পরে সে খেয়াল করে রাফিও খেলতে গিয়ে একই টোনে কথা বলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট শিশুরা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের ধরণ খুব দ্রুত নিজের মধ্যে গ্রহণ করে। যদি তারা সবসময় চিৎকার, অপমান বা রূঢ় ভাষা শুনে বড় হয়, তাহলে তারাও সেই পদ্ধতিতেই নিজের আবেগ প্রকাশ করতে শেখে।
অন্যদিকে, শান্ত ও সম্মানজনক ভাষা শুনে বড় হলে শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তুলনামূলক ভালো হয়। যেমন, এখন রাফি কিছু ভুল করলে শাহ আলম চেষ্টা করে “এভাবে করলে ভালো হয়” বা “আস্তে বলো”, এই ধরনের কথা বলতে। এতে শিশুও ধীরে ধীরে শান্তভাবে কথা বলা শিখছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সম্মানজনক যোগাযোগ শিশুর  মধ্যে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতাও বাড়াতে সাহায্য করে। যখন একটা শিশু “please”, “ধন্যবাদ”, “মাফ করবেন” বা “তুমি কষ্ট পাইছো?” এই ধরনের ভাষা শেখে, তখন সে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বও বুঝতে শুরু করে।
নিম্ন আয়ের বা চাপপূর্ণ পরিবারে অনেক সময় বাবা-মায়ের ধৈর্য ধরে কথা বলা কঠিন হয়ে যায়। সারাদিনের পরিশ্রম, আর্থিক চাপ, ক্লান্তি ইত্যাদির কারণে রাগ উঠে যাওয়া স্বাভাবিক। তাই মাঝে মাঝে ভুল হওয়া মানেই কেউ খারাপ বাবা-মা না।
গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের আচরণ নিয়ে সচেতন হওয়ার চেষ্টা করা।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, শিশুকে সম্মান দিয়ে কথা বললে সে নিজেও অন্যদের সম্মান করতে শেখে।
একদিন রাফি ভুল করে পানি ফেলে দিয়েছিল। আগে হলে হয়তো সে চিৎকার করত। এখন সে শুধু বলে, “সমস্যা নাই, আসো পরিষ্কার করি।” এতে রাফিও ভয় না পেয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর সাথে respectful tone-এ কথা বলা হয়, তারা সাধারণত কম defensive হয় এবং ভুল থেকে শেখার প্রবণতা বেশি থাকে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, respectful language শিশুর আত্মসম্মানের সাথেও জড়িত। যদি একটা শিশু সবসময় অপমানজনক ভাষা শুনে বড় হয়, তাহলে তার নিজের সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। কিন্তু তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলা হলে সে নিজেকেও মূল্যবান মনে করতে শেখে।
শাহ আলম এখন মাঝে মাঝে রাফিকে “ধন্যবাদ” বলে, এমনকি ছোট কাজে সাহায্য করলেও। এতে রাফির মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এই ছোট ছোট অভ্যাসই আসলে শিশুর ভবিষ্যতের সামাজিক আচরণের ভিত্তি তৈরি করে।
কারণ একটা শিশু প্রথমে পরিবারের ভেতরেই শেখে
•    মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়,
•    রাগ কিভাবে প্রকাশ করতে হয়,
•    আর সম্মান কাকে বলে।
তাই ভদ্র ও সম্মানজনক ভাষা শেখানো শুধু ভদ্রতা না, বরং শিশুকে মানসিকভাবে সুস্থ ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000