লোগো

ভাইবোনের ঈর্ষা: বড় সন্তানের রাগ ও নিরাপত্তাহীনতা কীভাবে সামলাবেন

ভাইবোনের ঈর্ষা: বড় সন্তানের রাগ ও নিরাপত্তাহীনতা কীভাবে সামলাবেন

প্রশ্নঃ আমি দুই সন্তানের মা। বড় মেয়ের বয়স ৫ বছর, ছোট ছেলের ২ বছর। ছোটটা হওয়ার পর থেকে বড় মেয়েটা খুব বদলে গেছে। ভাইকে কেউ আদর করলে ও রেগে যায়, মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে ওকে ধাক্কাও দেয়। আমরা দুজনকেই সমানভাবে ভালোবাসি, তারপরও ওর এমন আচরণ কেন হচ্ছে? কীভাবে ওকে বুঝাব?

দুই সন্তানের পরিবারে ছোট শিশুটি জন্মানোর পর বড় সন্তানের আচরণ বদলে যাওয়া খুব সাধারণ একটি বিষয়। বিশেষ করে বড় সন্তান যদি ৫ বছরের হয়, তাহলে সে অনেক কিছু বুঝতে পারে, কিন্তু নিজের অনুভূতি ঠিকভাবে বোঝাতে পারে না। তাই ভাইকে কেউ আদর করলে রেগে যাওয়া, মায়ের কোলে উঠতে চাওয়া, কথা না শোনা, এমনকি মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে ভাইকে ধাক্কা দেওয়া; এসব আচরণের পেছনে অনেক সময় রাগের চেয়ে বেশি থাকে ভয়, ঈর্ষা আর নিরাপত্তাহীনতা।
বড় মেয়েটি হয়তো ভাবছে, “আগে সবাই আমাকে আদর করত, এখন সবাই ভাইকে বেশি দেখে।” মা-বাবা দুজনকেই সমানভাবে ভালোবাসলেও শিশুর চোখে বিষয়টা আলাদা মনে হতে পারে। ছোট ভাইকে খাওয়ানো, কোলে নেওয়া, ঘুম পাড়ানো; এসব কাজ স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় নেয়। কিন্তু বড় সন্তানের কাছে মনে হতে পারে, তার জায়গাটা কেউ নিয়ে নিয়েছে। তাই সে ভাইয়ের প্রতি বিরক্তি দেখিয়ে আসলে মা-বাবার মনোযোগ চাইছে।
এ অবস্থায় প্রথম কাজ হলো, বড় মেয়েকে “খারাপ মেয়ে” বা “ঈর্ষাকাতর” বলে দাগিয়ে না দেওয়া। বরং তার অনুভূতিকে নাম দিতে সাহায্য করতে হবে। যেমন বলা যায়, “তুমি কি মন খারাপ করেছ, কারণ সবাই ভাইকে আদর করছে?” বা “তোমারও কি এখন একটু আদর দরকার?” এতে সে বুঝতে শিখবে, তার রাগের পেছনে একটা অনুভূতি আছে, আর মা-বাবা সেটা বুঝতে পারছেন।
তবে অনুভূতি বোঝা মানে খারাপ আচরণ মেনে নেওয়া নয়। ভাইকে ধাক্কা দিলে শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলতে হবে, “রাগ হওয়া ঠিক আছে, কিন্তু ধাক্কা দেওয়া ঠিক না। আমরা কাউকে আঘাত করি না।” তারপর তাকে একটু দূরে বসিয়ে শান্ত হতে সাহায্য করা যায়। চিৎকার, মারধর বা লজ্জা দিলে সে আরও বেশি মনে করতে পারে যে ভাইয়ের জন্যই তাকে বকা খেতে হচ্ছে।
প্রতিদিন বড় মেয়ের জন্য আলাদা ১০–১৫ মিনিট “শুধু তার সময়” রাখা খুব কাজে দেয়। এই সময়টায় মোবাইল, ছোট শিশুর কাজ, ঘরের কাজ; সব বাদ দিয়ে শুধু তার সঙ্গে গল্প করা, ছবি আঁকা, খেলনা দিয়ে খেলা বা বই পড়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সময় কম দেয়া হলেও যদি নিয়মিত সময় দেয়া হয় তবে সে বুঝবে, “আমার জায়গা এখনো আছে।”
ছোট ভাইয়ের যত্নে তাকে ছোট ছোটভাবে যুক্ত করা যায়, তবে দায়িত্ব চাপিয়ে নয়। যেমন, “তুমি কি ভাইয়ের জামাটা এনে দেবে?” বা “তুমি ভাইকে একটা গান শুনাবে?” কাজ করলে প্রশংসা করুন, “তুমি খুব সুন্দরভাবে সাহায্য করলে।” কিন্তু কখনোই বলবেন না, “তুমি বড়, তাই তোমাকে সব বুঝতে হবে।” ৫ বছরের শিশুও এখনো ছোট, তারও আদর দরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তুলনা না করা। “ভাই কত শান্ত, তুমি কেন এমন?”, এ ধরনের কথা বড় সন্তানের ঈর্ষা আরও বাড়ায়। বরং দুজনের আলাদা ভালো দিক আলাদাভাবে বলুন। বড় মেয়েকে মনে করিয়ে দিন, সে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, শুধু “বড় বোন” নয়, সে নিজেও আদরের সন্তান।
পরিবারের অন্যদেরও অনুরোধ করা যায়, ছোট শিশুকে আদর করার আগে বড় মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলতে। যেমন, “তুমি কেমন আছ?” বা “তোমার আঁকা ছবিটা দেখাও তো।” এতে সে নিজেকে বাদ পড়া মনে করবে না।
ধৈর্য ধরে, ভালোবাসা দিয়ে এবং স্পষ্ট সীমা রেখে এগোলে এই আচরণ ধীরে ধীরে কমে আসবে। বড় সন্তানের রাগকে সমস্যা হিসেবে না দেখে, তার ভেতরের ভয়কে বুঝতে পারলেই সমাধান অনেক সহজ হয়ে যায়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...