লোগো

মা অফিস থেকে ফিরলেই শিশুর আঁকড়ে থাকা: স্বাভাবিক, নাকি শিশুকে স্বাধীনতা শেখানো প্রয়োজন?

মা অফিস থেকে ফিরলেই শিশুর আঁকড়ে থাকা: স্বাভাবিক, নাকি শিশুকে স্বাধীনতা শেখানো প্রয়োজন?

প্রশ্নঃ আমি একজন কর্মজীবী মা। আমার ছেলের বয়স ৫ বছর, ওর কোনো ভাইবোন নেই। অফিস থেকে ফিরে দেখি ও শুধু আমার সঙ্গেই থাকতে চায়। আমি রান্নাঘরে গেলেও পেছনে পেছনে আসে। একা খেলতে চায় না। এটা কি স্বাভাবিক, নাকি ওকে ধীরে ধীরে স্বাধীন হতে শেখানো উচিত?

কর্মজীবী মায়েদের অনেকেই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, অফিস থেকে বাসায় ফিরতেই সন্তান শুধু মায়ের সঙ্গে থাকতে চায়। মা রান্নাঘরে গেলে পেছনে পেছনে যায়, ওয়াশরুমে গেলেও ডাকাডাকি করে, একা খেলতে চায় না। ৫ বছরের একমাত্র সন্তানের ক্ষেত্রে এই আচরণ দেখে মায়ের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, “এটা কি স্বাভাবিক, নাকি এখন থেকেই স্বাধীন হতে শেখানো দরকার”?
মূলত মায়ের প্রতি শিশুর এমন টান অস্বাভাবিক নয়। সারাদিন মা বাইরে থাকলে শিশুর মনে মাকে মিস করার অনুভূতি জমে থাকে। মা বাসায় ফেরার পর সে যেন দিনের সব ভালোবাসা একসঙ্গে নিতে চায়। বিশেষ করে একমাত্র সন্তান হলে তার খেলার সঙ্গী বা মনোযোগ ভাগ করার মতো ভাইবোন থাকে না। তাই মায়ের উপস্থিতিই তার কাছে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
তবে এটাও ঠিক, ৫ বছর বয়সে শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের মতো খেলতে, ছোট কাজ করতে এবং অল্প সময় মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকতে শেখানো দরকার। স্বাধীনতা মানে শিশুকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং নিরাপদ সম্পর্কের ভেতরে ছোট ছোট দায়িত্ব ও একা থাকার অভ্যাস তৈরি করা।
এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো বাসায় ফিরে শিশুকে সময় দেওয়া। অফিস থেকে ফিরেই যদি মা সরাসরি রান্না, ফোন, ঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান, তাহলে শিশুর আঁকড়ে থাকা আরও বাড়তে পারে। তাই ১০–১৫ মিনিট শুধু শিশুর জন্য রাখুন। তাকে জড়িয়ে ধরা, দিনের কথা শোনা, একটু খেলা বা গল্প করা, এই ছোট সময়টুকু তাকে বুঝায়, “মা ফিরেছে, মা আমারই আছে।” 
দ্বিতীয়ত, বাচ্চার স্বাধীনভাবে খেলার সময় খুব ছোট করে শুরু করুন। প্রথম দিন ৩০ মিনিট একা খেলতে বললে হবে না। বরং বলুন, “তুমি ৫ মিনিট ব্লক দিয়ে টাওয়ার বানাও, আমি রান্নাঘরে ডাল দেখে আসছি। তারপর এসে তোমারটা দেখব।” সময় কম হলে শিশুর ভয় কমে। পরে ৫ মিনিট থেকে ১০ মিনিট, তারপর ১৫ মিনিট করা যায়।
তৃতীয়ত, শিশুকে রান্নাঘরের নিরাপদ ছোট কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। যেমন টেবিলে চামচ রাখা, সবজি গোনা, প্লাস্টিকের বাটি সাজানো। এতে সে মায়ের কাছে থাকার সুযোগ পায়, আবার ধীরে ধীরে “আমি সাহায্য করতে পারি” এমন আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়।
চতুর্থত, বিদায় বা দূরে যাওয়ার সময় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবেন না। “আমি আসছি” বলে অনেকক্ষণ না গেলে শিশু আরও অনিরাপদ বোধ করে। বরং পরিষ্কারভাবে বলুন, “আমি ১০ মিনিট রান্নাঘরে থাকব, তারপর তোমার ছবি দেখতে আসব।” কথা রাখলে শিশুর ভরসা বাড়ে।
পঞ্চমত, একা খেললে প্রশংসা করুন। “তুমি আজ ৫ মিনিট নিজে নিজে খেলেছ, খুব ভালো চেষ্টা করেছ!”, এ ধরনের প্রশংসা শিশুকে উৎসাহ দেয়। কিন্তু “এত বড় হয়েছ, এখনো মায়ের পেছনে ঘুরো?”, এমন কথা তার লজ্জা ও নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
তবে যদি শিশু মায়ের কাছ থেকে সামান্য দূরে গেলেই খুব ভয় পায়, স্কুলে যেতে সমস্যা হয়, ঘুম-খাওয়া কমে যায়, বা এই আচরণ দিন দিন বাড়তে থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবশেষে, শিশুকে স্বাধীন করতে হলে আগে তাকে নিরাপদ অনুভব করাতে হয়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...