লোগো

“মোবাইল না দিলে কান্না” এর পেছনের মানসিক কারণ

“মোবাইল না দিলে কান্না” এর পেছনের মানসিক কারণ

আমার ছেলেটার বয়স এখন তিন বছর। কিছুদিন আগেও একটা সময় ছিল, যখন মোবাইল না দিলে ও এমন কান্না করত যে আমি সত্যি ভয় পেয়ে যেতাম। রান্না করছি, ছোট মেয়েটাকে সামলাচ্ছি, ঘরের কাজ বাকি, এই অবস্থায় চুপ করানোর সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল মোবাইল হাতে ধরিয়ে দেওয়া। শুরুতে ব্যাপারটা নিরাপদ মনে হয়েছিল। কার্টুন দেখছে, ছড়া শুনছে, আমি একটু কাজ করতে পারছি, খারাপ কী? কিন্তু ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, মোবাইল বন্ধ করলেই রাগ, কান্না, জিনিস ছোড়া, খেতে না চাওয়া, এসব আচরণ বাড়ছে। তখন বুঝলাম, এটা শুধু “বাচ্চার জেদ” না, এর পেছনে মানসিক কারণও আছে।

ছোট শিশুরা, বিশেষ করে ০–৩ বছর বয়সে, খুব দ্রুত বাইরের জিনিসের সাথে ইমোশনালি অ্যাটাচড হয়ে যায়। আর মোবাইল তাদের জন্য খুব স্ট্রং স্টিমুলেশন তৈরি করে। রঙিন ভিডিও, দ্রুত সিন চেঞ্জ, গান, সাউন্ড , সব মিলিয়ে তাদের মস্তিষ্ক একধরনের ইনস্ট্যান্ট এক্সাইটমেন্ট পায়।
ফলে বাস্তব জীবনের সাধারণ খেলাধুলা বা কথা বলা তখন তুলনামূলক কম ইন্টারেস্টিং লাগে।
আমার নিজের ছেলের ক্ষেত্রেও এটা দেখেছি। আগে ব্লক নিয়ে অনেকক্ষণ খেলত। কিন্তু মোবাইলে অভ্যস্ত হওয়ার পর পাঁচ মিনিটও মনোযোগ ধরে রাখতে চাইত না। সবকিছুতেই বিরক্ত হয়ে যেত।
আরেকটা বিষয় আমি পরে বুঝেছি, অনেক সময় শিশুরা আসলে মোবাইল না, মনোযোগ চায়।
আমরা ব্যস্ত থাকি, ক্লান্ত থাকি। আমি নিজেও অনেক সময় বলতাম, “এই নাও মোবাইলটা, মা একটু কাজ করি।” তখন ও চুপ হয়ে যেত। কিন্তু এতে ধীরে ধীরে ও শিখে ফেলেছিল, একা লাগলে  মোবাইলই কমফোর্ট। মানে মোবাইল একটা ইমোশনাল রিপ্লেসমেন্ট হয়ে গিয়েছিল।
এখনকার সময়ে এটা খুব কমন সমস্যা। বিশেষ করে আমাদের মতো পরিবারে, যেখানে মা একাই বাচ্চা সামলায়, সাথে রান্না, কাপড় ধোয়া, সংসার সব কিছু। অনেক সময় সারভাইভাল এর জন্যই মোবাইল দিতে হয়। তাই আমি কাউকে দোষ দিই না। কারণ বাস্তবতা অনেক কঠিন।
কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি, শিশুকে হঠাৎ করে মোবাইল থেকে পুরো দূরে সরিয়ে ফেললেও সমস্যা হয়।
আমি একবার রাগ করে পুরো মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ফল হলো, ছেলে আরও অ্যাগ্রেসিভ (Aggressive) হয়ে গেল। পরে একটু বুঝে অ্যাপ্রোচ (Approach) বদলাই।
প্রথমে স্ক্রিন টাইম কমানো শুরু করি। আগে যেখানে খাওয়ার সময়ও মোবাইল চলত, সেখানে ধীরে ধীরে সেটা বন্ধ করি। প্রথম কয়েকদিন খুব কান্না করেছে। কিন্তু আমি মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
যেমন—
“চলো বারান্দায় যাই।”
“চলো গাড়ি গুনি।”
“চলো পানি দিয়ে খেলি।”
সবসময় কাজ করে না, কিন্তু ধীরে ধীরে ইমপ্রুভমেন্ট (Improvement) আসে।
আরেকটা জিনিস আমি ইচ্ছা করে করা শুরু করি, ওর সাথে ছোট ছোট ইন্টারঅ্যাকশন (Interaction) বাড়ানো।
অনেক সময় আমরা ভাবি বন্ডিং মানে বড় কিছু। আসলে পাঁচ মিনিট মন দিয়ে কথা বলাও শিশুর কাছে অনেক বড় ব্যাপার। আমি এখন রান্নাঘরে কাজ করলেও ছেলেকে পাশে দাঁড় করিয়ে কথা বলি। ওকে ছোট ছোট কাজ দিই। এতে তারও কাজে অংশগ্রহণের অনুভূতি তৈরি হয়।
আমার স্বামীও এখন বাসায় ফিরে ফোনে কম সময় দেয়। কারণ আমরা বুঝেছি, বাচ্চারা শুধু কথা শুনে না, অনুকরণ ও করে। বাবা-মা সারাক্ষণ স্ক্রিনে থাকলে শিশুরাও স্বাভাবিকভাবে ওইদিকে টান অনুভব করবে।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক শিশুই মোবাইল ব্যবহার করে ওভারস্টিমুলেশন (Overstimulation) এর কারণে  অনেক বেশি খিটখিটে হয়ে যায়। ঘুম কম হয়, মনোযোগ কমে, দ্রুত রেগে যায়। তখন বাবা-মা ভাবে বাচ্চা “অতিরিক্ত জেদি” হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক সময় ব্রেইন একটু শান্ত পরিবেশ চায়।
এখনো আমার ছেলে মাঝে মাঝে মোবাইল চায়। কান্নাও করে কখনো। আমি সবসময় সম্পূর্ণভাবে দক্ষতার সাথে সামলাতে পারি না। ক্লান্ত দিনে এখনো মোবাইল ধরিয়ে দিই। কিন্তু আগের মতো নির্ভরশীল না।
আমি শুধু একটা জিনিস শিখেছি, শিশুর কান্নার পেছনে সবসময় জেদ থাকে না। অনেক সময় সেখানে একঘেয়েমি থাকে, মনোযোগের চাহিদা থাকে, এবং তার মধ্যে আবেগগত সংযুক্তির (emotional attachment) প্রয়োজনও থাকে।
মোবাইল কিছু সময়ের জন্য শিশুকে শান্ত রাখে ঠিকই, কিন্তু বাবা-মায়ের সময়, কথা আর উপস্থিতির বিকল্প কখনো হতে পারে না।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000