
আমরা যৌথ পরিবারে না থাকলেও আমার স্বামীর ছোট বোন আমাদের সাথেই থাকে। তাই বাসায় সবসময় পারস্পরিক যোগাযোগ, ভাগাভাগি করা, মানিয়ে নেওয়া এসব চলতেই থাকে। আর এই পরিবেশে একটা জিনিস আমি অনুধাবন করেছি, শিশু শুধু শুনে নয়, দেখেও শেখে।
আমার ছেলে এখন তিন বছরের। এই বয়সে ও “ধন্যবাদ”, “দাও”, “আমারটা”, “না চাই” এসব খুব স্পষ্টভাবে বলতে শুরু করেছে। তখন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি, সম্মানজনক আচরণ আসলে কীভাবে শেখানো যায়?
কারণ সম্মানজনক আচরণ মানে শুধু বড়দের সালাম দেওয়া না। সম্মানজনক আচরণ মানে
• অন্যের কথা শোনা
• শেয়ারিং শেখা
• জোরে কথা না বলা
• অপেক্ষা করতে শেখা
• ছোট-বড় সবাইকে সম্মান করা
• নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা
আর যৌথ পরিবারেএগুলো শেখার সুযোগ অনেক বেশি থাকে।
তবে সত্যি কথা বলতে, এই পরিবেশে চ্যালেঞ্জ ও কম না। একজন বারণ করলে আরেকজন আদর করে দেয়। কেউ বলে “ও তো ছোট”, কেউ বলে “এখন থেকেই শৃঙ্খলা শেখা প্রয়োজন।” ফলে শিশুর জন্য মিক্সড সিগনাল তৈরি হয়।
আমার নিজের ছেলের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। আমি কোনো বিষয়ে “না” বলেছি, পরে ফুপু গিয়ে সেটা দিয়ে দিয়েছে। তখন ও ন্যাচারালি কনফিউজড হয়েছে।
পরে বুঝেছি, সম্মানজনক আচরণ শেখাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো কনসিস্টেন্সি আর মডেলিং।
বিজ্ঞান অনুযায়ী, ছোট শিশুরা অবজারভেশনাল লার্নিং-এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি শেখে। অর্থাৎ তারা বড়দের আচরণ অনুসরণ করে। আপনি যদি বাসায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে চিৎকার করে কথা বলেন, শিশুর সাথে খারাপ আচরণ করেন কিন্তু শিশুকে “ভদ্র হও” বলেন, সেটা খুব এফেক্টিভ হয় না। তাছাড়া কাউকে সম্মান করা জোর করে শেখানো যায় না।
যেমন আগে আমি মাঝে মাঝে বলতাম:
“এখনই সালাম দাও!”
“এভাবে কথা বলো না!”
কিন্তু পরে খেয়াল করলাম, চাপ দিলে ও আরও রিয়্যাক্ট করে। এখন আমি আগে এক্সপ্লেইন করার চেষ্টা করি।
যেমন:
“ফুপু কথা বলছে, তাই আমরা একটু অপেক্ষা করি।”
“দাদু ক্লান্ত, তাই আস্তে কথা বলি।”
এতে শিশুর মধ্যে অন্যের প্রতি সহানুভূতিও গড়ে ওঠে।
রিসার্চ বলছে, ২–৫ বছর বয়সে শিশুদের আবেগগত দিকনির্দেশনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু নিয়ম না, নিয়ম এর পেছনের আবেগের ব্যাখ্যা দেওয়াও প্রয়োজন।
আর যৌথ পরিবার-তে শেয়ারিং শেখার সুযোগও বেশি থাকে।
আমার ছেলে আগে খেলনা শেয়ার করতে চাইত না। এটা আসলে এই বয়সে স্বাভাবিক। কারণ এই বয়সি শিশুদের মধ্যে ownership feeling strong থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে চর্চার মাধ্যমে শেয়ারিং শেখানো যায়।
এখন আমি জোর করে খেলনা কেড়ে নিই না। বরং বলি:
“তুমি দুই মিনিট খেলো, তারপর ফুপুকে দিই।”
এতে টার্ন-টেকিং স্কিল ডেভেলপ হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর সামনে বড়দের সম্মান করা।
আমরা যদি নিজেরাই বাসার বড়দের সাথে খারাপ টোনে এ কথা বলি, তাহলে শিশুও সেটাই স্বাভাবিক ভাববে। আমার স্বামীও এখন বাসায় ফিরে চেষ্টা করে ছেলের সামনে শান্ত টোনে কথা বলতে।
তবে একটা বিষয় আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, শিশুকে সম্মান শেখানো মানে তাকে অতিরিক্ত বাধ্য বানানো না। অনেক পরিবারে ‘ভদ্র’ মানে শিশুর কোনো মতামত থাকবে না, সবসময় চুপ থাকবে অমনটা করা হয়। কিন্তু অন্যকে সম্মান দেয়ার সাথে সাথে নিজের কথা বলা ও আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা থাকাও প্রয়োজন।
আমি চাই আমার সন্তান সবাইকে সম্মান করুক, কিন্তু নিজের অস্বস্তিও ভদ্রভাবে বলতে শিখুক।
যেমন কেউ জোর করে কোলে নিতে চাইলে ‘না’ বলা খারাপ না। এটা healthy boundary এর অংশ।
আমি এখনো সবকিছু পুরোপুরি ঠিকভাবে সামলাতে পারি না। কখনো রেগে যাই, কখনো ধৈর্য হারাই। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি যৌথ পরিবারে শিশুর চরিত্র গঠন অনেকটাই নির্ভর করে সে প্রতিদিন কী ধরনের আচরণ দেখছে তার ওপর।
শুধু ‘ভদ্র হও’ বললেই হয় না। তাকে প্রতিদিন সম্মান, ধৈর্য আর সহানুভূতি (empathy) দেখতে দিতে হয়।
কারণ ছোট শিশুরা আসলে আমাদের কথা কম, আমাদের আচরণটাই বেশি মনে রাখে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন