লোগো

রাস্তাঘাটের পরিবেশে শিশুকে নিরাপদ রাখবেন কিভাবে?

রাস্তাঘাটের পরিবেশে শিশুকে নিরাপদ রাখবেন কিভাবে?

শাহ আলমের বাসা রাস্তার পাশের এক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে রিকশা, মোটরসাইকেল, ভ্যান, মানুষের ভিড়, সবসময় একটা ব্যস্ত পরিবেশ। তার তিন বছরের ছেলে রাফি প্রায়ই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। একটু সুযোগ পেলেই দৌড়ে রাস্তার দিকে চলে যেতে চায়। এই বিষয়টা নিয়ে শাহ আলম আর তার স্ত্রী সবসময় চিন্তায় থাকে। কারণ তারা জানে, ছোট শিশুরা খুব কৌতূহলী হয়, কিন্তু বিপদ বোঝার ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫ বছরের নিচের শিশুরা তাৎক্ষণিক আবেগের বশে আচরণ বেশি করে। অর্থাৎ তারা হঠাৎ করে দৌড় দিতে পারে, কিছু দেখে রাস্তা পার হতে যেতে পারে, বা বিপজ্জনক জিনিস ধরতে চাইতে পারে, কারণ তাদের মস্তিষ্কের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি বিচার করার ক্ষমতা তখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি।
তাই রাস্তাঘাটের পরিবেশে শিশুকে নিরাপদে রাখা শুধু “সাবধানে থাকো” বলার বিষয় না, বরং নিয়মিত নজরদারি ও অভ্যাস গড়ে তোলার ব্যাপার।
শাহ আলম আগে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে রাফিকে রাস্তার পাশে খেলতে দিত। একদিন হঠাৎ একটা মোটরসাইকেল খুব কাছ দিয়ে চলে গেলে সে ভয় পেয়ে যায়। এরপর থেকে সে বুঝতে পারে, কয়েক সেকেন্ডের অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।
শিশু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট শিশুকে কখনো ব্যস্ত রাস্তার পাশে একা রাখা ঠিক না। কারণ তারা গাড়ির গতি বা দূরত্ব ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। এমনকি অনেক সময় বাবা-মায়ের ডাকও উপেক্ষা করে দৌড়ে চলে যেতে পারে। তাই বাইরে গেলে শিশুর হাত ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাস্তা পার হওয়ার সময়।
শাহ আলম এখন রাফিকে একটা ছোট নিয়ম শেখানোর চেষ্টা করছে, রাস্তা পার হওয়ার আগে দাঁড়াতে হবে, দুই পাশে তাকাতে হবে, তারপর বড়দের সাথে হাঁটতে হবে।
যদিও রাফি এখনো পুরোপুরি বোঝে না, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তা অভ্যাসের পুনরাবৃত্ত অনুশীলন শিশুর মধ্যে নিরাপত্তা সম্পর্কিত অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করে।
রাস্তার পরিবেশে আরেকটা বড় ঝুঁকি হলো অপরিচিত মানুষ। অনেক নিম্ন আয়ের এলাকায় শিশুরা রাস্তায় বেশি সময় কাটায়। ফলে অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলা বা কোথাও চলে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট শিশুদের ভয় দেখিয়ে না, বরং সহজ ভাষায় “পরিচিত মানুষ”, আর “কাউকে না বলে কোথাও না যাওয়া”,  এসব শেখানো দরকার।
শাহ আলম এখন রাফিকে বলে, “আব্বু-আম্মু ছাড়া কোথাও যাইবা না।” সে রাগ দেখিয়ে না, বরং গল্পের মতো করে বোঝানোর চেষ্টা করে।
এছাড়া রাস্তার পরিবেশে ধুলোবালি ও জীবাণুর ঝুঁকিও বেশি থাকে। ছোট শিশুরা মাটিতে বসে খেলে, তারপর হাত মুখে দেয়। এতে পেটের অসুখ বা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই বাইরে থেকে এসে হাত ধোয়ার অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অনেক সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর সামনে বড়দের আচরণ। যদি বড়রা হুটহাট রাস্তা পার হয়, ট্রাফিক না মেনে চলে বা চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ায়, তাহলে শিশুরাও সেটা নকল করে। কারণ শিশু বড়দের দেখেই আচরণ শেখে।
শাহ আলম এখন চেষ্টা করে রাফির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় নিয়ম মেনে চলতে। কারণ সে বুঝেছে, শুধু মুখে শেখালে হবে না, নিজের আচরণ দিয়েও শেখাতে হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, সব পরিবার নিরাপদ এলাকায় থাকে না। অনেক শিশুই ছোট ঘর, ব্যস্ত রাস্তা আর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বড় হয়। এজন্য বাবা-মায়ের অপরাধবোধে ভোগার প্রয়োজন নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো যতটুকু সম্ভব সচেতন থাকা।
শাহ আলম এখনো প্রতিদিন সংগ্রাম করে। কিন্তু সে একটা জিনিস বুঝেছে, ছোট শিশুর নিরাপত্তা শুধু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিলে হয় না।
প্রতিদিনের ছোট ছোট সতর্কতা, নজর রাখা, আর ধৈর্য ধরে শেখানো, এগুলোই শিশুকে রাস্তাঘাটের ঝুঁকির মধ্যেও একটু নিরাপদ রাখতে সাহায্য করতে পারে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000