
ফাহমিদা বেগম ছোটবেলায় খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। সংসারের অভাব, দ্রুত কাজের দায়িত্ব, সব মিলিয়ে অল্প বয়সেই স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। এখন গার্মেন্টসে দীর্ঘ সময় কাজ করার পরে মাঝে মাঝে তিনি মেয়েদের পড়তে বসা দেখেন আর মনে মনে ভাবেন, “ছেলে-মেয়েদেরকে যেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি।”
বাংলাদেশের অনেক নিম্নআয়ের পরিবারেই এই অনুভূতি খুব পরিচিত। মা-বাবারা নিজেরা কষ্ট করে হলেও চান সন্তান যেন একটু ভালো ভবিষ্যৎ পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন সংসারে টাকার টান পড়ে, তখন অনেক সময় শিশুর শিক্ষাই সবার আগে ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
কেউ ভাবে, “এখন কাজ শিখলে বেশি লাভ”, কেউ ভাবে “এত পড়ালেখা করে কী হবে?” আবার অধিকাংশ পরিবারেই মেয়েদের শিক্ষাকে ছেলেদের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু শিশু বিকাশ ও সামাজিক গবেষণা বলছে, শিশুর শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ না বরং এটি তার পুরো জীবন, চিন্তা, স্বাস্থ্য, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সাথে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিক্ষা শিশুর Brain Development এর অন্যতম বড় ভিত্তি। ছোটবেলায় শেখা ভাষাগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, স্মরণশক্তি এবং সোশ্যাল ইন্টার্যাকশন ভবিষ্যতের শেখার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
ফাহমিদার বড় মেয়েটা আগে খুব চুপচাপ ছিল। স্কুলে নিয়মিত যাওয়া শুরু করার পরে সে এখন নিজের কথা কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারে। শিক্ষক কী বলেছে, নতুন কী শিখেছে , এসব নিয়ে কথা বলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা শিশুর self-confidence ও communication skill বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা শিশুকে শুধু বইয়ের জ্ঞান দেয় না, বাস্তব জীবন বুঝতেও সাহায্য করে।
যেমনঃ
নিজের অধিকার জানা
স্বাস্থ্যবিধি বোঝা
ভুল তথ্য চিনতে পারা
টাকা-পয়সার হিসাব শেখা
সিদ্ধান্ত নেওয়া
এসবও শিক্ষার অংশ।
বিশ্বব্যাংক ও UNICEF-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত শিশু বড় হয়ে সাধারণত স্বাস্থ্য, আয় এবং পরিবারের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার প্রভাব আরও গভীর। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত মেয়েরা ভবিষ্যতে শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন হয়, অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার ঝুঁকি কমে, নিজেদের সন্তানদের শিক্ষাতেও বেশি গুরুত্ব দেয়।
ফাহমিদা এই কারণেই মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করতে চান না, যদিও অনেক সময় খরচ চালানো কঠিন হয়ে যায়।
তবে কম আয়ের পরিবারে একটা বাস্তব সমস্যা হলো, শিক্ষা অনেক সময় “দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ” মনে হয়, কিন্তু সংসারের প্রয়োজন থাকে “তাৎক্ষণিক”। যেমনঃ বড় সন্তানকে কাজে পাঠালে আজই কিছু টাকা আসতে পারে। কিন্তু পড়াশোনার ফল পেতে সময় লাগে। এখানেই অনেক পরিবার দ্বিধায় পড়ে যায়।
ফাহমিদার বড় মেয়েটাও মাঝে মাঝে ছোট ভাইকে সামলায়, বাসার কাজে সাহায্য করে। কিন্তু ফাহমিদা চেষ্টা করেন যেন তার পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ না হয়। কারণ স্কুলে ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে অনেক শিশুই পরে আর নিয়মিত শিক্ষায় ফিরতে পারে না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা মানেই দামি স্কুল না।
অনেক মা-বাবা guilt feel করেন কারণ তারা কোচিং বা প্রাইভেট দিতে পারেন না। কিন্তু শিশুর শেখার সবচেয়ে বড় ভিত্তি এখনও family support।
যেমনঃ
পড়তে উৎসাহ দেওয়া
স্কুলে যেতে motivate করা
ছোট achievement-এ প্রশংসা করা
প্রশ্ন করলে বিরক্ত না হওয়া
এসব শিশুর learning motivation বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
ফাহমিদা ক্লান্ত থাকলেও মাঝে মাঝে মেয়ের খাতা খুলে বসেন। সব বুঝতে পারেন না, তবু জিজ্ঞেস করেন—
“আজ কী শিখছো?”
এই simple involvement-ও শিশুর কাছে অনেক বড় ব্যাপার হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন শিশু অনুভব করে তার শেখাকে পরিবার গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন তার নিজের motivation-ও বাড়ে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার নম্বর না।
অনেক শিশু পড়ায় average হতে পারে, কিন্তু অন্য skill-এ ভালো। কেউ আঁকতে পারে, কেউ গল্প বলতে পারে, কেউ হিসাব ভালো পারে। তাই শুধু marks দিয়ে শিশুর মূল্য নির্ধারণ করা ঠিক না।
ফাহমিদার ছোট মেয়েটা পড়ার চেয়ে ছবি আঁকতে বেশি ভালোবাসে। আগে এজন্য বকা খেত। এখন মা মাঝে মাঝে তাকে আঁকার সময়ও দেন।
কারণ স্বাস্থ্যকর শেখার পরিবেশ মানে শিশুর কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখা।
সবশেষে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, দারিদ্র্য একজন শিশুর শুরুটা কঠিন করতে পারে, কিন্তু শেখার সুযোগ পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া উচিত না।
আর একজন মা-বাবার সবচেয়ে বড় শক্তি অনেক সময় টাকা না, বরং এই বিশ্বাস,
“আমার সন্তান শিখতে পারবে, এগোতে পারবে।”
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন