লোগো

শিশুর সাথে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট Quality Time কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

শিশুর সাথে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট Quality Time কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আমি একজন চাকরিজীবী বাবা। সকাল থেকে অফিস ও সংসারের দায়িত্ব সামলিয়ে দিনের শেষে মনে হয় নিজের জন্যই সময় থাকে না। কিন্তু বাবা হওয়ার পর বুঝতে পারলাম শিশুদের সবসময় অনেক খেলনা, দামি জিনিস বা বড় আউটিং দরকার হয় না। অনেক সময় তারা শুধু চায় বাবা-মা একটু মন দিয়ে তাদের পাশে বসুক।

আমার চার বছরের ছেলে প্রায়ই রাতে এসে বলে, “বাবা, তুমি আমার সাথে একটু খেলবা?” আগে অনেক সময় ক্লান্তির কারণে বলতাম, “আজকে না, পরে।” কিন্তু পরে খেয়াল করলাম, ও আসলে খেলনার চেয়ে আমার অ্যাটেনশনটাই বেশি খুঁজছে।
মনোবিজ্ঞান আর চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ বলছে, শিশুর সাথে নিয়মিত কোয়ালিটি টাইম কাটানো তাদের মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস আর ইমোশনাল সিকিউরিটির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর মজার ব্যাপার হলো, সেই সময়টা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হতে হবে এমনও না। প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট মনোযোগ দিয়ে, ডিস্ট্র্যাকশন ছাড়া সময় দিলেও শিশুর উপর বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অনেকেই মনে করেন, একই ঘরে থাকা মানেই কোয়ালিটি টাইম। কিন্তু বাস্তবে কোয়ালিটি টাইম মানে হলো এমন সময়, যখন বাবা-মা পুরো মনোযোগ শিশুর দিকে দেন।
যেমন:
• মোবাইল ছাড়া কথা বলা
• একসাথে খেলাধুলা করা
• গল্প শোনা
• ছবি আঁকা
• শুধু শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা
অর্থাৎ কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটি এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি আগে বাসায় ফিরে মোবাইল হাতে নিয়েই বসে থাকতাম। ছেলে পাশে খেললেও আমার মনোযোগ থাকত না। পরে বুঝেছি, শিশুরা খুব সহজেই বুঝে ফেলে বাবা-মা সত্যি তাদের সাথে কানেক্ট করছে কি না।
শিশুর পার্সোনালিটি গঠনের সবচেয়ে বড় ভিত্তিগুলোর একটি হলো ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট।
যখন শিশু প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও অনুভব করে যে
• “আমার কথা শোনা হচ্ছে”
• “আমাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে”
• “বাবা-মা আমার সাথে থাকতে পছন্দ করে”
তখন তার ইমোশনাল সিকিউরিটি অনেক বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট থাকা শিশুরা সাধারণত 
• বেশি কনফিডেন্ট হয়
• সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন ভালো পারে
• স্ট্রেস তুলনামূলকভাবে ভালো হ্যান্ডেল করতে পারে
আমি নিজেও খেয়াল করেছি, যেদিন ছেলের সাথে কিছু সময় মন দিয়ে খেলি বা কথা বলি, সেদিন ওর আচরণও অনেক বেশি শান্ত থাকে।
Harvard Center on the Developing Child-এর রিসার্চ অনুযায়ী, ছোট শিশুদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট অনেকটাই ইন্টারঅ্যাকশনের উপর নির্ভর করে।
যখন বাবা-মা শিশুর সাথে
• কথা বলেন
• প্রশ্ন করেন
• রেসপন্স দেন
• গল্প করেন
তখন শিশুর ল্যাঙ্গুয়েজ স্কিল (Language Skill) আর থিংকিং এবিলিটি (Thinking Ability) ডেভেলপ হয়। মানে শুধু কার্টুন দেখে শেখার চেয়ে রিয়েল কনভারসেশন অনেক বেশি পাওয়ারফুল।
আমার ছেলে এখন “কেন?” প্রশ্ন খুব করে। আগে ক্লান্ত হয়ে অনেক সময় এড়িয়ে যেতাম। এখন চেষ্টা করি অন্তত কিছু প্রশ্ন ধৈর্য নিয়ে উত্তর দিতে। কারণ কৌতূহল বাড়ানো করাও লার্নিং-এর অংশ।
অনেক সময় শিশুদের ট্যানট্রাম, মনোযোগ চাওয়া বা বিরক্তিকর আচরণের পেছনে ইমোশনাল কানেকশনের অভাবও কাজ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পজিটিভ প্যারেন্ট-চাইল্ড ইন্টারঅ্যাকশন শিশুদের সেলফ-রেগুলেশন ডেভেলপ করতে সাহায্য করে।
আমি খেয়াল করেছি, যেদিন আমি খুব ব্যস্ত থাকি আর ছেলের সাথে ঠিকভাবে কানেক্ট করতে পারি না, সেদিন ও বেশি জেদ করে। কিন্তু একটু সময় নিয়ে খেললে বা কথা বললে ও অনেক বেশি কোঅপারেটিভ থাকে।
আমাদের মতো মিডল-ক্লাস পরিবারে সবসময় বাইরে ঘুরতে যাওয়া বা এক্সপেন্সিভ অ্যাক্টিভিটি করা সম্ভব না। কিন্তু কোয়ালিটি টাইমের জন্য আসলে টাকার দরকার সবসময় হয় না।
যেমন:
• একসাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা
• গল্প বানানো
• পিলো ফাইট
• ড্রইং করা
• ১৫ মিনিট ব্লকস দিয়ে খেলা
• ঘুমানোর আগে গল্প বলা
এসব সিম্পল জিনিসই শিশুর কাছে অনেক বেশি স্মৃতিময় হয়ে যায়।
শুধু শিশুর জন্য না, কোয়ালিটি টাইম বাবা-মায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ওয়ার্কিং ফাদার হিসেবে অনেক সময় গিল্ট কাজ করে, “আমি কি বাচ্চাদের যথেষ্ট সময় দিচ্ছি?”
কিন্তু প্রতিদিন অন্তত কিছু ফোকাসড সময় কাটালে সেই ইমোশনাল ডিস্ট্যান্স (Emotional Distance) অনেকটাই কমে যায়।
শিশুও তখন বুঝতে পারে, 
“বাবা ব্যস্ত হলেও আমার জন্য সময় রাখে।”
এখানে একটা জিনিস আমি নিজেও ধীরে ধীরে শিখেছি, শিশুর সাথে বসে থেকেও যদি বারবার নোটিফিকেশন দেখি, তাহলে কানেকশনটা নষ্ট হয়ে যায়।
American Academy of Pediatrics বলছে, “টেক-ফ্রি প্যারেন্ট-চাইল্ড ইন্টারঅ্যাকশন” শিশুদের ইমোশনাল ডেভেলপমেন্টের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখন চেষ্টা করি অন্তত ওই ১৫ মিনিট মোবাইল দূরে রাখতে।
আমরা অনেক বাবা-মা ভবিষ্যতের চিন্তায় এত ব্যস্ত হয়ে যাই যে বর্তমানের ছোট মুহূর্তগুলো মিস করি। আমি এখন বুঝি, আমার ছেলে হয়তো মনে রাখবে না আমি কোন বছরে কত ওভারটাইম করেছি। কিন্তু সে হয়তো মনে রাখবে, ঘুমানোর আগে বাবা তার পাশে বসে গল্প বলত কি না।
শিশুরা সবসময় পারফেক্ট প্যারেন্টস চায় না। তারা চায় উপস্থিত বাবা-মা।
আর অনেক সময় প্রতিদিনের এই ছোট ১৫ মিনিটই একটা শিশুর মনে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা আর ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করে।

 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...