লোগো

শিশুর সামনে অপমানজনক বা অশালীন ভাষা ব্যবহার কতটা ক্ষতিকর?

শিশুর সামনে অপমানজনক বা অশালীন ভাষা ব্যবহার কতটা ক্ষতিকর?

ফাহমিদা বেগমদের বাসার পাশের ঘর থেকে প্রায়ই উচ্চস্বরে ঝগড়ার শব্দ ভেসে আসে। কখনো স্বামী-স্ত্রীর তর্ক, কখনো অপমানজনক কথা, আবার কখনো গালাগালি। শুরুতে তিনি ভাবতেন, ছোট বাচ্চারা এসব বুঝতে পারে না। কিন্তু একদিন হঠাৎ দেখলেন, তার তিন বছরের ছেলে রাগের মাথায় বড় বোনকে এমন একটি খারাপ শব্দ বলছে, যা সে নিশ্চয়ই কোথাও শুনে শিখেছে। সেদিনই তিনি উপলব্ধি করলেন, শিশুরা শুধু আমাদের কথা শোনে না, আমাদের ভাষা ও আচরণও শেখে।

আমাদের সমাজে অনেক পরিবারেই রাগের সময় কটু কথা বলা বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করা খুব সাধারণ ব্যাপার। “চুপ কর”, “বিরক্ত করিস না”, “তুই কিছুই পারিস না” এমন কথাগুলো অনেক সময় অভ্যাসের মতো ব্যবহার করা হয়। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, শিশুর সামনে নিয়মিত এমন ভাষা ব্যবহার করলে তা তাদের মানসিক বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ছোট শিশুরা খুব দ্রুত ভাষা ও আচরণ শিখে। তারা শুধু শব্দ মুখস্থ করে না, বরং শেখে মানুষ রাগ হলে কীভাবে কথা বলে, মতের অমিল হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
ফাহমিদার বড় মেয়েটাও একসময় ছোট ভাইকে খুব ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে বলত। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি খেয়াল করলেন, বিরক্ত হলেই সে ধমক দিয়ে কথা বলছে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি বড়দের আচরণ দেখে শেখার ফল।
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার Social Learning Theory অনুযায়ী, শিশুরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভাষা, আচরণ এবং আবেগ প্রকাশের ধরন শেখে। তাই পরিবারের বড়রা যেভাবে কথা বলেন, শিশুরাও ধীরে ধীরে সেটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে।
তবে এর প্রভাব শুধু ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো শিশুকে যদি নিয়মিত অপমান করা হয় বা কটু কথা শুনতে হয়, তাহলে তার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। সে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
ফাহমিদার এক আত্মীয় প্রায়ই তার সন্তানকে বলতেন, “তুই কোনো কাজের না।” সময়ের সঙ্গে দেখা গেল, শিশুটি নতুন কিছু করতে ভয় পায় এবং নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। কারণ শিশুদের কাছে মা-বাবা বা বড়দের কথা অনেক সময় সত্যের মতোই মনে হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর সামনে বড়দের একে অপরকে অপমান করা। যদি কোনো শিশু নিয়মিত চিৎকার, গালি বা অসম্মানজনক আচরণ দেখতে থাকে, তাহলে সে মানসিকভাবে অস্বস্তি ও অনিরাপত্তা অনুভব করতে পারে। অনেক শিশুর মধ্যে তখন অতিরিক্ত কান্না, ভয়, রাগ, ঘুমের সমস্যা বা চুপচাপ হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যায়।
ফাহমিদাও খেয়াল করেছিলেন, যেদিন বাসায় বেশি ঝগড়া হয়, সেদিন তার ছোট ছেলে বেশি কান্না করে এবং মেয়েটা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে যায়। কারণ শিশুরা সবকিছু বুঝতে না পারলেও ঘরের আবেগপূর্ণ পরিবেশ খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারে।
তবে এটাও সত্যি যে, কোনো মানুষই সবসময় শান্ত থাকতে পারে না। মা-বাবারও রাগ হতে পারে, ভুল হতে পারে। সমস্যা তখনই হয়, যখন কটু ভাষা ও অপমানজনক আচরণ নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হয়ে যায়।
এখন ফাহমিদা চেষ্টা করেন রাগ হলেও গালাগালি না করতে। কখনো ধৈর্য হারিয়ে ফেললে পরে সন্তানদের কাছে গিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন বা দুঃখ প্রকাশ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন "repair conversation" শিশুর মনে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
বাস্তবতাও হলো, আর্থিক চাপ, কাজের ক্লান্তি বা পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই কঠোর হয়ে যায়। তাই শুধু ভাষা বদলালেই হবে না, পরিবারের মানসিক চাপ কমানো এবং একে অপরকে সহানুভূতি দেখানোও জরুরি।
ফাহমিদা এখন একটি ছোট অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। রাগ খুব বেশি হলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। সবসময় সফল হন না, কিন্তু চেষ্টা করেন।
কারণ তিনি বুঝেছেন, শিশুর সামনে আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, তা শুধু আজকের কথোপকথন নয়; সেটাই তাদের ভবিষ্যতের যোগাযোগের ধরন, আত্মবিশ্বাস এবং সম্পর্কের ধারণাকে গড়ে তোলে।
একটি শিশু প্রথম ভাষা শেখে পরিবার থেকে। আর সেই ভাষা যদি সম্মান, ধৈর্য ও মমতায় ভরা হয়, তাহলে তার মনও অনেক বেশি নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে বড় হতে পারে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000