
আমি আগে সত্যি একটা জিনিস বিশ্বাস করতাম, ছোট বাচ্চারা বড়দের কথা ঠিকমতো বোঝে না। তাই তাদের সামনে একটু উচ্চস্বরে কথা বলা বা তর্ক-বিতর্ক হলে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু মা হওয়ার পর ধীরে ধীরে বুঝেছি, শিশুরা অনেক কিছু ভাষায় বুঝতে না পারলেও পরিবেশ অনুভব করতে পারে। আমার ছেলে যখন প্রায় দুই বছরের, একদিন আমি আর ওর বাবা একটা বিষয় নিয়ে একটু জোরে কথা বলছিলাম। খুব বড় কিছু না, সাধারণ সংসারের ব্যাপার। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলাম, ছেলে চুপচাপ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর এসে আমার কাপড় ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
পরে এটা নিয়ে ভেবে বুঝতে পারলাম, শিশুরা বাবা-মায়ের মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের ভঙ্গি আর শরীরী ভাষা খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে। তারা সব কথা বুঝতে না পারলেও উত্তেজনা বা অস্বস্তি টের পায়।
আসলে শিশুর নিরাপত্তাবোধ অনেকটাই নির্ভর করে তার চারপাশের পরিবেশের ওপর। যখন বাসায় বারবার চিৎকার, ঝগড়া বা আক্রমণাত্মক আচরণ হয়, তখন শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কে চাপের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
ফলে অনেক শিশুর মধ্যে দেখা যেতে পারে,
• অতিরিক্ত ভয় পাওয়া
• সবসময় বাবা-মায়ের কাছে থাকতে চাওয়া
• ঘুমের সমস্যা
• বেশি কান্না করা
• সহজেই বিরক্ত হয়ে যাওয়া
• আক্রমণাত্মক আচরণ
• কম কথা বলা
আমার ছেলে ছোট থাকতেই একটা বিষয় খেয়াল করেছিলাম, বাসায় অস্বস্তিকর পরিবেশ থাকলে ও বেশি রেগে যেত বা ছোট বিষয়েও কান্না করত। আগে বুঝতাম না, এর সঙ্গে পরিবেশের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।
পরে জানতে পারি, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সব মতের অমিল বা তর্ক ক্ষতিকর না।
বাস্তব জীবনে স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকবেই। শিশুকে কখনোই সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত পরিবার দেখানো সম্ভব না। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, মতের অমিলকে সম্মানজনকভাবে সমাধান করা শিশুদের জন্য ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে।
অর্থাৎ বড়রা যদি শান্তভাবে কথা বলে, একে অপরের কথা শোনে, ভুল হলে ক্ষমা চায় বা সমাধানের পথ খুঁজে নেয়, তাহলে শিশুরাও সমস্যা মোকাবিলার সঠিক উপায় শিখতে পারে।
ক্ষতিকর হয় তখন, যখন
• নিয়মিত চিৎকার করা হয়
• অপমান করা হয়
• ভয় দেখানো হয়
• কটু বা আঘাতমূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়
• রাগের মাথায় জিনিসপত্র ছোড়া হয়
• শিশুকে ঝগড়ার মধ্যে টেনে আনা হয়
এই ধরনের পরিবেশ শিশুর নিরাপত্তাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আমাদের সমাজে একটা বিষয় খুব সাধারণ, “বাচ্চার সামনে কিছু হয়নি” এমন ভাব দেখানো। কিন্তু ছোট শিশুরা পরিবেশের অস্বস্তি টের পেলেও সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না।
অনেক সময় তারা নিজেরাই ভাবতে শুরু করতে পারে, “আমার কারণে কি মা-বাবা রাগ করেছে?”
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এমন অনুভূতি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
আমি এখন একটা বিষয় মেনে চলার চেষ্টা করি, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা তর্ক হলে ছেলের সামনে না করার চেষ্টা করি। সবসময় তা সম্ভব হয় না, কিন্তু সচেতন থাকার চেষ্টা করি।
আর যদি কখনো ওর সামনে উচ্চস্বরে কথা হয়েও যায়, পরে পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। ওকে বাড়তি আশ্বাস দিই। কারণ ছোট শিশুদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ অনুভব করা।
আমার স্বামীও এখন বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব দেয়। আগে ভাবত, “ও তো কিছুই বোঝে না।” এখন ও নিজেই খেয়াল রাখে, যেন কথা বলার ভঙ্গি খুব কঠোর না হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা শুধু ঝগড়া দেখে না, সম্পর্কের ধরনও শেখে।
তারা দেখে—
• মানুষ রাগ হলে কীভাবে আচরণ করে
• মতের অমিল কীভাবে সামলায়
• একে অপরকে সম্মান করে কি না
• পরে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করে কি না
এসবই ধীরে ধীরে তাদের নিজের সামাজিক আচরণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ, এক-দুদিন সামান্য তর্ক হলেই বাবা-মায়ের অপরাধবোধে ভোগার প্রয়োজন নেই। সন্তান লালন-পালনে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি নিজেও এখনও শিখছি। কখনো ধৈর্য হারাই, কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু একটা বিষয় বুঝেছি, শিশুর সামনে আমরা শুধু কথা বলি না, আমরা তাদের মানসিক জগতও গড়ে তুলি।
তাই অনেক সময় একটু নিচু স্বরে কথা বলা, একটু থেমে নেওয়া, বা পরে গিয়ে শিশুকে জড়িয়ে ধরা, এই ছোট ছোট কাজগুলোই তার মনে নিরাপত্তা ও ভরসার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন