লোগো

শিশুর স্ক্রিন টাইম: শুধু বিনোদন নয়, শেখার সুযোগও হতে পারে

শিশুর স্ক্রিন টাইম: শুধু বিনোদন নয়, শেখার সুযোগও হতে পারে

আমাদের বাসায় একটা সময় ছিল, যখন স্ক্রিন টাইম নিয়ে আমি খুবই বিরক্ত হয়ে যেতাম। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে দেখতাম, আমার মেয়ে ট্যাবলেট নিয়ে কার্টুন দেখছে। প্রথমে মনে হতো, পুরো বিষয়টাই একদম বন্ধ করে দিই। কিন্তু পরে বুঝলাম, আজকের সময়ে স্ক্রিন পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশু স্ক্রিনে কী দেখছে, কতক্ষণ দেখছে, আর কীভাবে ব্যবহার করছে। সত্যি বলতে, সব স্ক্রিন টাইম একরকম না।

নিষ্ক্রিয় স্ক্রিন ব্যবহার, যেমন লাগামহীন ভিডিও দেখা বা খুব দ্রুত বদলানো দৃশ্যের কনটেন্টগুলো শিশুর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, ঘুমের রুটিন আর আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধরনের কনটেন্ট মস্তিষ্ককে অতিরিক্তভাবে উত্তেজিত করে ফেলে। ফলে বাস্তব জীবনের সাধারণ কাজগুলো পরে তাদের কাছে কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।
কিন্তু যদি চিন্তাভাবনা করে ব্যবহার করা হয়, তাহলে শিক্ষামূলক স্ক্রিন সময় ভিন্নভাবে কাজে লাগতে পারে।
আমি ধীরে ধীরে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি, যেগুলো আমাদের ক্ষেত্রে ভালো ফল দিয়েছে।
প্রথম পরিবর্তন ছিল কনটেন্ট বাছাই। আগে ইউটিউব যেটা সামনে আনত, মেয়েও সেটাই দেখত। এখন আমি বয়স উপযোগী শিক্ষামূলক ভিডিও বেছে দিই। যেমনঃ বর্ণ শেখা, গল্প বলা, গণনা, প্রকৃতি নিয়ে ভিডিও বা সহজ সমস্যা সমাধানের কনটেন্ট।
আমি লক্ষ্য করেছি, শিশু যখন শুধু দেখে না, বরং অংশ নেয়, তখন শেখাটা অনেক বেশি কার্যকর হয়। যেমন কোনো ছড়া চলাকালে সে গুনে গুনে সংখ্যা বলে, প্রাণী চিনে বা প্রশ্নের উত্তর দেয়, তখন স্ক্রিন শুধু বিনোদন না হয়ে শেখার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একসাথে দেখা বা পাশে বসে থাকা। গবেষণাতেও দেখা যায়, ছোট শিশু স্ক্রিন থেকে বেশি শেখে যখন একজন বড় মানুষ তার সাথে থাকে। তাই এখন মাঝে মাঝে আমি ওর পাশে বসে প্রশ্ন করি,
“এটা কোন প্রাণী?”
“এরপর কী হতে পারে?”
“এই রঙটার নাম কী?”
এতে স্ক্রিন সময়টা আরও কথোপকথনভিত্তিক হয়ে ওঠে এবং শিশুর ভাষা শেখাও সহজ হয়।
আমরা একটা রুটিনও মেনে চলার চেষ্টা করি। খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর ১ ঘন্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করে দেই। কারণ ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার করলে অনেক সময় শিশুর ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
তার বদলে সন্ধ্যার দিকে শান্ত পরিবেশ রাখার চেষ্টা করি, বই দেখা, আঁকাআঁকি, ব্লক দিয়ে খেলা বা গল্প শোনা।
আরেকটা বিষয় আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে চলি, শিশুকে শান্ত করার একমাত্র উপায় হিসেবে স্ক্রিন দেওয়া। আগে অনেক সময় ব্যস্ত থাকলে দ্রুত ট্যাবলেট দিয়ে দিতাম। এতে সাময়িকভাবে সুবিধা হলেও পরে শিশুর মধ্যে বিরক্তি বা অপেক্ষা করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। সে ধীরে ধীরে শিখে ফেলে, প্রতিবার বিরক্ত হলেই স্ক্রিন দরকার।
তবে আমি এটাও বুঝেছি, চাকরিজীবী বাবা-মা হিসেবে সবসময় নিখুঁত রুটিন মেনে চলা সহজ না। ক্লান্ত দিনের শেষে অনেক সময় স্ক্রিনই সবচেয়ে সহজ সমাধান মনে হয়। এই বাস্তবতা অনেক পরিবারেই আছে।
তাই এখন আমি “পুরো বন্ধ করা” বা “পুরো ছেড়ে দেওয়া”, এই দুই প্রান্তিক চিন্তার বদলে সচেতন ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিই।
লক্ষ্য হলো, স্ক্রিন যেন শিশুর কৌতূহল, শেখা, ভাষা, সৃজনশীলতা আর চিন্তাভাবনাকে সমর্থন করে।
কারণ আজকের শিশুরা ডিজিটাল পরিবেশের মধ্যেই বড় হচ্ছে। তাই শুধু স্ক্রিনকে দোষ না দিয়ে, কীভাবে স্বাস্থ্যকরভাবে ব্যবহার শেখানো যায়, সেটাই এখনকার সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্যারেন্টিং কালচার-এর অংশ।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000