লোগো

সংগ্রামী পরিবেশে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ানো

সংগ্রামী পরিবেশে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ানো

শাহ আলমের ছেলে রাফির বয়স এখন তিন বছর। ছোট্ট একটা ঘরে তাদের সংসার। বাইরে রাস্তার শব্দ, পাশের ঘরের মানুষের ঝগড়া, কখনো টাকার চিন্তা, সব মিলিয়ে পরিবেশটা খুব শান্ত না। তবুও শাহ আলম একটা জিনিস খুব খেয়াল করে। রাফি যখন কিছু করতে গিয়ে ভয় পায়, বা “আমি পারবো না” বলে পিছিয়ে যায়, তখন তার নিজের বুকটাও কেমন হালকা কেঁপে ওঠে। কারণ সে জানে, অভাবের মধ্যে বড় হওয়া শিশুরা অনেক সময় খুব ছোট বয়স থেকেই নিজের সম্পর্কে হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করে।

অনেক বাবা-মা মনে করেন আত্মবিশ্বাস মানে শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা বা সবার সামনে সাহসী হওয়া। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞানে আত্মবিশ্বাসের অর্থ আরও গভীর। আত্মবিশ্বাস মানে হলো, “আমি চেষ্টা করতে পারি”, “ভুল করলে আবার শিখতে পারবো”, “আমি গুরুত্বপূর্ণ”  এই অনুভূতিগুলো তৈরি হওয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে মূলত পরিবারের আচরণ, নিরাপদ সম্পর্ক, এবং ছোট ছোট সফল অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। টাকা-পয়সা বা বড় বাসা আত্মবিশ্বাসের একমাত্র উৎস না। বরং শিশুর সাথে কেমন কথা বলা হচ্ছে, সে কতটুকু সম্মান পাচ্ছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শাহ আলম আগে রাফি কিছু ফেললে বা ভেঙে ফেললে রেগে যেত। “তুই কিছুই ঠিকমতো পারিস না”,  এমন কথাও মুখ দিয়ে বের হয়ে যেত। পরে একদিন পাশের স্কুলের এক শিক্ষক তাকে বলেন, ছোট শিশুরা ভুল করতে করতেই শেখে। বারবার নেতিবাচক কথা শুনলে শিশুর মনে “আমি খারাপ” বা “আমি অযোগ্য” এই ধারণা জন্মাতে পারে। এরপর থেকে শাহ আলম একটু বদলানোর চেষ্টা করে।
এখন রাফি নিজে জামা পরতে গেলে ভুল করলেও সে বলে, “আবার চেষ্টা করো, তুমি পারবা।” এই ছোট বাক্যগুলো শিশুর মস্তিষ্কে অনেক প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানীরা একে positive reinforcement বা ইতিবাচক উৎসাহ বলেন। অর্থাৎ, শিশুর চেষ্টাকে উৎসাহ দেয়া তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।
সংগ্রামী পরিবেশে বড় হওয়া শিশুদের একটা বড় সমস্যা হলো, তারা অনেক সময় নিজেদের অন্যদের থেকে “কম” ভাবতে শুরু করে। বিশেষ করে যখন তারা দেখে অন্য বাচ্চাদের বেশি খেলনা, ভালো জামা বা বড় স্কুল আছে।
এখানে বাবা-মায়ের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে সবসময় অন্যের সাথে তুলনা করলে তার আত্মসম্মান কমে যায়। “দেখো পাশের ছেলেটা কত ভালো”, এই ধরনের কথা শিশুর মনে চাপ তৈরি করে।
তাই তাদের ছোট ছোট অগ্রগতি লক্ষ্য করা দরকার। যেমন, রাফি আগে মানুষের সামনে কথা বলতে লজ্জা পেত। একদিন দোকান থেকে নিজে বিস্কুট কিনে আনতে পারায় শাহ আলম তাকে খুব প্রশংসা করে। এতে রাফির মুখে যে হাসি এসেছিল, সেটা শাহ আলম অনেকদিন মনে রেখেছিল।
শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো তাকে ছোট দায়িত্ব দেয়া। যেমনঃ বাজারের ব্যাগ ধরে রাখা, খেলনা গুছানো, গাছে পানি দেয়া। এতে শিশু মনে করে সে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য।
বিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট দায়িত্ব পালন করতে পারলে শিশুর মধ্যে স্বনির্ভরতা তৈরি হয়। অর্থাৎ, সে নিজের কাজ নিজে করতে শেখে এবং নিজের উপর বিশ্বাস বাড়ে।
এছাড়া শিশুর কথা মন দিয়ে শোনাও খুব জরুরি। অনেক গরিব পরিবারে বড়দের চাপ এত বেশি থাকে যে শিশুর অনুভূতির দিকে মন দেয়ার সময় থাকে না। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক মিনিট শিশুর সাথে গল্প করা, তার কথা শোনা, তাকে জড়িয়ে ধরা, এগুলো তার মানসিক নিরাপত্তা বাড়ায়। আর মানসিক নিরাপত্তা ছাড়া আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় না।
শাহ আলম এখনো ধনী হয়নি। সংসারের কষ্টও কমেনি। কিন্তু সে বুঝেছে, সন্তানের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সবচেয়ে দরকার “আমি তোমার পাশে আছি”, এই অনুভূতি দেয়া।
একটা শিশু যখন বিশ্বাস করতে শেখে যে তার ভুল করা স্বাভাবিক, চেষ্টা করা মূল্যবান, আর সে পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তখন সংগ্রামের মধ্যেও তার ভবিষ্যৎ বিকাশের ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে।
অভাব হয়তো সবসময় দূর হয় না, কিন্তু সঠিক আচরণ একটা শিশুকে ভিতর থেকে শক্ত মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000