লোগো

স্ক্রিন টাইমকে কীভাবে লার্নিং টাইমে রূপান্তর করবেন?

স্ক্রিন টাইমকে কীভাবে লার্নিং টাইমে রূপান্তর করবেন?

একটা সময় ছিল, যখন আমি ভাবতাম ছোট বাচ্চাদের হাতে মোবাইল বা ট্যাব দেওয়া মানেই খারাপ অভ্যাস। বিশেষ করে একজন মা হিসেবে সবসময় একটা ভয় কাজ করত, বেশি স্ক্রিন ব্যবহার কি আমার মেয়ের মনোযোগ, আচরণ বা শেখার ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে? কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। শিশুরা এখন এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে স্মার্ট ডিভাইস তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তখন আমি বিষয়টাকে অন্যভাবে ভাবা শুরু করি। “কীভাবে পুরোপুরি বন্ধ করব” এর বদলে “কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার শেখাব”, এই চিন্তাটাই আমার কাছে বেশি বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে।

আমার মেয়েও ছোট থেকেই ছড়া শোনা, গল্প দেখা, ছবি দেখে শেখা বা অক্ষর শেখার ভিডিওর প্রতি আগ্রহ দেখাত। শুরুতে আমি শুধু স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমানোর দিকেই বেশি মন দিতাম। পরে বুঝলাম, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে স্মার্ট ডিভাইস শেখার একটি কার্যকর মাধ্যমও হতে পারে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব বিষয়বস্তু শিক্ষামূলক নয়।
অনেক অ্যাপ বা ভিডিও দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য শিশুকে দীর্ঘ সময় পর্দার সামনে ধরে রাখা। খুব দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, অতিরিক্ত শব্দ বা অতিরিক্ত উত্তেজনামূলক উপস্থাপন ছোট শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই এখন আমি বিষয়বস্তু বাছাই করার সময় অনেক বেশি সচেতন থাকি। আমি এমন জিনিস বেছে দেওয়ার চেষ্টা করি, যেগুলো শিশুকে শুধু তাকিয়ে থাকতে না শিখিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। যেমন—
• অক্ষর চেনা
• সংখ্যা শেখা
• ধাঁধা সমাধান
• সমস্যা সমাধানের খেলা
• গল্প শোনা
• প্রাণী ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানা
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমি পরে বুঝেছি, শুধু স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে দিলেই শেখা হয় না। ছোট শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে তখনই, যখন মা-বাবা বা পরিবারের বড় কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং শেখার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
তাই এখন আমি চেষ্টা করি মেয়ের পাশে বসতে। ও কিছু দেখলে আমি প্রশ্ন করি,
“এখানে কী দেখলে?”
“এই প্রাণীটা কী করছে?”
“এরপর কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?”
এতে শুধু শেখাই হয় না, শিশুর ভাষা প্রকাশের দক্ষতা এবং চিন্তাশক্তিও বাড়ে।
আরেকটা বিষয় আমি খুব গুরুত্ব দিই “সময়ের সীমা”।
আগে অনেক সময় ক্লান্ত থাকলে সহজ সমাধান হিসেবে ট্যাব দিয়ে দিতাম। এতে কিছুক্ষণ শান্ত থাকত, আমিও একটু বিশ্রাম নিতে পারতাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, একটু বিরক্ত লাগলেই বা মন খারাপ হলেই সে স্ক্রিন চাইছে।
তাই এখন চেষ্টা করি অন্য কিছুতে মনোযোগ ফেরাতে। কখনো রং করা, কখনো ব্লক নিয়ে খেলা, কখনো গল্পের বই পড়া।
আমরা বাসায় কিছু ছোট নিয়মও মানার চেষ্টা করি। যেমন,
• খাওয়ার সময় স্ক্রিন নয়
• ঘুমানোর আগে ডিভাইস নয়
• একটানা দীর্ঘ সময় ব্যবহার নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতে স্ক্রিনের আলো শিশুর ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আর ছোট শিশুদের সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য ভালো ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আমি এটাও মানি, সবসময় নিখুঁতভাবে সবকিছু সামলানো সম্ভব হয় না। ব্যস্ত জীবনে স্মার্ট ডিভাইস অনেক সময় সত্যিই সাহায্য করে। কিন্তু পার্থক্যটা তৈরি হয় তখনই, যখন ডিভাইস শুধু শিশুকে ব্যস্ত রাখার মাধ্যম না হয়ে শেখার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আমি এখন প্রযুক্তিকে পুরোপুরি খারাপ কিছু হিসেবে দেখি না। বরং এটা একটি উপকরণ। আর যেকোনো উপকরণের মতোই, সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে শিশুরা প্রযুক্তির মধ্যেই বড় হবে। তাই শুধু দূরে রাখার চেয়ে, সঠিকভাবে ব্যবহার শেখানোই হয়তো এখনকার সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবকত্বের দক্ষতাগুলোর একটি।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000