
Upper-class পরিবারগুলোতে এখন খাবারের সহজলভ্যতা অনেক বেশি। ফুড ডেলিভারি, অতিরিক্ত প্রসেস করা স্ন্যাক, ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিঙ্কস, এসব খুব সহজেই প্রতিদিনের রুটিনের অংশ হয়ে যাচ্ছে। অনেক বাবা মা ভালোবেসেই বাচ্চার পছন্দের খাবার এনে দেন। আমরাও অনেক সময় ক্লান্ত দিনের শেষে সহজ সমাধান হিসেবে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করি। কিন্তু সমস্যা হলো...
কিছুদিন আগে মেয়েকে নিয়ে একটা বার্থডে পার্টিতে গিয়েছিলাম। সেখানে খেয়াল করলাম প্রায় সব বাচ্চার হাতেই সফট ড্রিঙ্ক, চিপ্স, চকলেট বা ফাস্ট ফুড। বিষয়টা যদিও নতুন কিছু না, কিন্তু একজন ডাক্তার আবার মা - দুই দিক থেকেই আমি একটা বিষয় খুব খেয়াল করি। সেটা হলো, ইদানিং আপার ক্লাস আর আপার মিডল ক্লাস পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে অবিসিটি (obesity) বা ওজনাধিক্যের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। একসময় আমাদের দেশে অপুষ্টি নিয়ে বেশি কথা হতো। তবে এখন তার পাশাপাশি শিশুদের ওজনাধিক্য ও দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষ করে শহরের সচ্ছল পরিবারগুলোতে এই সমস্যাটা আরও তীব্র হয়ে উঠছে। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ একসাথে কাজ করছে। প্রথমত, লাইফস্টাইল-এর পরিবর্তন। বর্তমানে অধিকাংশ শিশুর দৈনন্দিন জীবন আগের মতো অ্যাক্টিভ না। স্কুল, কোচিং, ইন্ডোর কার্যক্রম, স্ক্রিন টাইম সব মিলিয়ে শারীরিক খেলাধুলার সময় অনেক কমে গেছে।
আমাদের ছোটবেলায় বিকেলে মাঠে দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, লুকোচুরি খেলা- এগুলো খুব স্বাভাবিক ছিল। এখন শহরের অনেক শিশুর শৈশব এপার্ট্মেন্ট আর স্ক্রিন এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কম শারীরিক নড়াচড়া এবং বেশি সময় বসে থাকা Childhood Obesity এর বড় কারণগুলোর একটি।
দ্বিতীয়ত, খুব সহজে ক্যালরি রিচ খাবার পাওয়া। Upper-class পরিবারগুলোতে এখন খাবারের সহজলভ্যতা অনেক বেশি। ফুড ডেলিভারি, অতিরিক্ত প্রসেস করা স্ন্যাক, ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিঙ্কস, এসব খুব সহজেই প্রতিদিনের রুটিনের অংশ হয়ে যাচ্ছে। অনেক বাবা মা ভালোবেসেই বাচ্চার পছন্দের খাবার এনে দেন। আমরাও অনেক সময় ক্লান্ত দিনের শেষে সহজ সমাধান হিসেবে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করি। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব খাবারে অনেক সময় অতিরিক্ত প্রসেসড চিনি, অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট আর প্রচুর ক্যালরি থাকে, অথচ তুলনামূলকভাবে পুষ্টি থাকে খুবই কম।
বিশেষ করে সফট ড্রিঙ্ক, জুস আর প্যাকেটজাত খাবার শিশুদের ওজন দ্রুত বাড়াতে পারে। আরেকটা বিষয় আমাদের সমাজে প্রচলিত, “খাওয়া মানেই ভালোবাসা” কালচার। অনেক পরিবারে বেশি অ্যাপেটাইট কে সুস্বাস্থ্যের একমাত্র সাইন মনে করা হয়। বাচ্চা একটু বেশি খেলে সবাই খুশি হয়। কিন্তু শিশুর শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি নিয়মিত গেলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে শুরু করে।
শিশুদের ওজনাধিক্যের সাথে স্ক্রিন টাইমের সম্পর্কও খুব স্ট্রং। যখন শিশুরা দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাবলেট বা টিভি দেখে, তখন মুভমেন্ট কমে যায়। একই সাথে মাইন্ডলেস স্ন্যাকিং-ও বাড়ে। অনেক সময় বাচ্চারা কার্টুন দেখতে দেখতে বুঝতেই পারে না যে কতটা খেয়ে ফেলছে। রিসার্চ অনুযায়ী, বেশি স্ক্রিন টাইম শিশুদের ওজনাধিক্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুম। আপার-ক্লাস আরবান ফ্যামিলিতে অনেক শিশুর রুটিন এখন খুব ইরেগুলার হয়ে যাচ্ছে। দেরিতে ঘুমানো, লেট-নাইট স্ক্রিন ইউজ- এগুলোও ওজন বাড়ার সাথে সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হাঙ্গার-রেগুলেটিং হরমোনের উপর প্রভাব পড়ে, ফলে ওভারইটিং টেনডেন্সি বাড়তে পারে।
তবে একটা বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলা জরুরি, ওবেসিটি শুধু অ্যাপিয়ারেন্সের বিষয় নয়। শিশুদের অতিরিক্ত ওজন ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার, ফ্যাটি লিভার, জয়েন্ট প্রবলেম এবং লো সেলফ-এস্টিমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বিষয়টিকে “মোটা মানেই হেলদি” ভেবে ইগনোর করা মোটেই ঠিক নয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাবা-মা হিসেবে আমাদের মূল গুরুত্ব দেওয়া উচিত ভারসাম্যের উপর। শিশুকে পুরোপুরি বাধা-নিষেধের মধ্যে রাখা যেমন ভালো নয়, তেমনি প্রতিদিন জাঙ্ক ফুড আর স্ক্রিননির্ভর জীবনযাপনও স্বাস্থ্যকর নয়। আমি বাসায় কিছু ছোট ছোট নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি। যেমন, প্রতিদিন কিছু সময় শারীরিক খেলাধুলা, নিয়মিত ফল খাওয়া, সফট ড্রিংক না দেয়া, পরিবারের সবাই মিলে একসাথে খাওয়ার সময় রাখা আর স্ক্রিনের বদলে বাইরে খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া।
সবশেষে আমি বলবো, শিশুর সুস্থ জীবনযাপন শুধু খাবারের তালিকা দিয়ে তৈরি হয় না, এটা পুরো পরিবারের পরিবেশ ও জীবনধারার সাথে জড়িত। কারণ শিশুরা আমরা মুখে কী বলি তার চেয়ে অনেক বেশি অনুসরণ করে আমাদের জীবনযাপন করার স্টাইল।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন