
প্রশ্নঃ আমি প্রথমবার বাবা হয়েছি। আমার মেয়ের বয়স এখন ১ বছর, ওর আর কোনো ভাইবোন নেই। আমরা চেষ্টা করি ওর সামনে ঝগড়া না করতে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। এত ছোট বাচ্চা কি এসব বুঝতে পারে? আমাদের আচরণ কি ওর মানসিক বিকাশে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে?
প্রথমবার বাবা হলে শিশুর ছোট ছোট আচরণ নিয়েও অনেক চিন্তা হওয়া খুব স্বাভাবিক। ১ বছরের শিশু কথা বলতে পারে না, নিজের অনুভূতি বুঝিয়ে বলতে পারে না, তাই অনেক সময় মনে হয়, “ও কি সত্যিই আমাদের কথা কাটাকাটি বোঝে?” উত্তর হলো, পুরো বিষয়টি বড়দের মতো বুঝতে না পারলেও, শিশুরা ঘরের আবহ, কণ্ঠের স্বর, মুখের ভাব, শরীরের অস্থিরতা, এসব খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারে।
১ বছরের শিশু হয়তো বুঝবে না মা-বাবা কী নিয়ে কথা কাটাকাটি করছেন। কিন্তু সে বুঝতে পারে, পরিবেশটা শান্ত নাকি অশান্ত। হঠাৎ জোরে কথা বলা, রাগী মুখ, দরজা জোরে বন্ধ করা, দীর্ঘ সময় মন খারাপ থাকা, এসব তার জন্য চাপের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এত ছোট বয়সে শিশুর নিরাপত্তাবোধ অনেকটাই মা-বাবার আচরণ, সাড়া দেওয়া এবং ঘরের শান্ত পরিবেশের ওপর নির্ভর করে।
তবে এর মানে এই নয় যে মা-বাবার মধ্যে একবারও মতবিরোধ হওয়া যাবে না। বাস্তব জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল হবেই। সমস্যা হয় তখন, যখন ঝগড়া খুব ঘন ঘন হয়, অনেক জোরে হয়, অপমানজনক ভাষা ব্যবহার হয়, বা পরে কেউ শিশুর সামনে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করে না। শিশুর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হলো মা-বাবা রাগ করলেও পরে শান্ত হতে পারেন, কথা বলে সমাধান করতে পারেন এবং ঘর আবার নিরাপদ হয়ে যায়।
আপনারা যেহেতু চেষ্টা করেন শিশুর সামনে ঝগড়া না করতে, সেটাই ভালো শুরু। তবে মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হয়ে গেলে ভয় না পেয়ে “repair” করা জরুরি। যেমন, শিশুর সামনে যদি কণ্ঠস্বর একটু উঁচু হয়ে যায়, পরে তাকে কোলে নিয়ে শান্ত গলায় বলা যায়, “বাবা-মা একটু জোরে কথা বলেছিল, কিন্তু এখন সব ঠিক আছে।” শিশু সব কথা বুঝবে না, কিন্তু আপনার শান্ত কণ্ঠ, স্পর্শ ও মুখের ভাব তাকে নিরাপদ অনুভব করাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর সামনে অপমানজনক কথা, দোষারোপ, হুমকি বা দীর্ঘ নীরব রাগ এড়িয়ে চলা। মতবিরোধ হলে চেষ্টা করুন শিশুর ঘুমের সময় বা অন্য ঘরে শান্তভাবে কথা বলতে। যদি তখনই কথা বলা দরকার হয়, তাহলে কণ্ঠস্বর নিচু রাখা, “তুমি সবসময়…” ধরনের দোষারোপের বদলে “আমার এমন লাগছে…” দিয়ে কথা শুরু করা ভালো।
শিশুর সামনে ভালো সম্পর্কের উদাহরণও দেখানো দরকার। যেমন, মা-বাবা একে অন্যকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন, ভুল হলে দুঃখিত বলছেন, একসঙ্গে হাসছেন, শিশুর যত্ন ভাগ করে নিচ্ছেন যা শিশুর মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সে শেখে, মানুষ রাগ করতে পারে, আবার ভালোবাসা ও সম্মান দিয়ে সম্পর্ক ঠিকও করতে পারে।
যদি ঘরে ঝগড়া খুব ঘন ঘন হয়, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়, বা একজন আরেকজনকে ভয় পান তাহলে এটাকে শুধু “সন্তানের জন্য চিন্তা” হিসেবে না দেখে প্রাপ্তবয়স্কদের সহায়তার বিষয় হিসেবেও দেখা দরকার। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা বিশ্বস্ত সহায়তা নেওয়া ভালো।
সবশেষে মনে রাখবেন, শিশুর জন্য নিখুঁত মা-বাবা দরকার নেই। দরকার নিরাপদ, সাড়া দেওয়া, ভালোবাসাপূর্ণ মা-বাবা।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন