
প্রশ্নঃ আমি একজন বাবা। আমার দুই ছেলে, বড়টার বয়স ৯ বছর আর ছোটটার ৬ বছর। বড় ছেলে ছোট ভাইয়ের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কী খেলবে, কী করবে, সবকিছুতেই ওর কথা শুনতে হবে। না শুনলে খুব রেগে যায়। এটা কি স্বাভাবিক, নাকি এখন থেকেই ঠিক করা উচিত?
৯ বছর বয়সী বড় ছেলে যদি ৬ বছর বয়সী ছোট ভাইয়ের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যেমনঃ কী খেলবে, কোন খেলনা ধরবে, কীভাবে খেলবে, তাহলে বাবা-মায়ের চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় বড় সন্তান নিজেকে “দায়িত্বশীল” বা “বড়” মনে করে ছোট ভাইকে নির্দেশ দিতে চায়। কিছুটা নেতৃত্ব দেখানো এই বয়সে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি সে ছোট ভাইয়ের পছন্দ, স্বাধীনতা বা মতামতকে জায়গা না দেয়, না শুনলে খুব রেগে যায়, তাহলে বিষয়টি এখন থেকেই নরমভাবে ঠিক করা দরকার।
বড় সন্তানের এমন আচরণের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। সে হয়তো ভাবছে, বড় বলে তার কথা সবাইকে শুনতে হবে। আবার কখনো সে মা-বাবার মনোযোগ পেতে চায়। ছোট ভাইকে নিয়ন্ত্রণ করলে তার মনে হয়, “আমি গুরুত্বপূর্ণ।” অনেক সময় বড় সন্তান ছোট ভাইয়ের ভুল সহ্য করতে পারে না, কারণ সে সবকিছু নিজের মতো ঠিকঠাক দেখতে চায়। তাই শুধু “বসগিরি করো না” বললে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো যায় না।
প্রথমে বড় ছেলের ভালো দিকটি আলাদা করে স্বীকার করতে হবে। যেমন বলা যায়, “তুমি ভাইকে নিয়ে খেলতে চাও, এটা ভালো। কিন্তু ভাইয়েরও নিজের পছন্দ আছে।” এতে সে বুঝবে, তাকে পুরোপুরি ভুল বলা হচ্ছে না; শুধু আচরণের সীমা শেখানো হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারে একটি পরিষ্কার নিয়ম দরকার: “খেলায় সবার মতামত থাকবে।” দুই ভাই খেলতে বসলে আগে থেকেই বলা যায়, “প্রথম ১০ মিনিট তুমি খেলা বেছে নেবে, পরের ১০ মিনিট ভাই বেছে নেবে।” এতে বড় ছেলে নেতৃত্বের সুযোগ পায়, আবার ছোট ভাইও নিজের পছন্দ প্রকাশ করতে শেখে।
তৃতীয়ত, ছোট ভাইয়ের হয়ে সবসময় বাবা-মা কথা বললে ছোটটি আরও নির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে। তাই তাকে সহজ বাক্য শেখানো যায়: “আমি এটা খেলতে চাই”, “এখন আমার পালা”, “তুমি বললে আমি কষ্ট পাই।” বড় ভাইকে শেখানো যায়, “তুমি বলতে পারো”, “চলো, আমরা এটা খেলি”, কিন্তু জোর করা যাবে না।”
চতুর্থত, রেগে গেলে সীমা টানতে হবে। বড় ছেলে যদি চিৎকার করে, খেলনা কেড়ে নেয় বা ভয় দেখায়, শান্তভাবে বলুন, “রাগ হতে পারে, কিন্তু জোর করা বা ভয় দেখানো যাবে না। এখন আমরা একটু বিরতি নেব।” তারপর কয়েক মিনিট আলাদা করে শান্ত হওয়ার সুযোগ দিন। শাস্তি নয়, নিরাপত্তা ও সম্মানের নিয়ম, এইভাবে বিষয়টা দেখানো ভালো।
পঞ্চমত, বড় ছেলের জন্য আলাদা দায়িত্ব দেওয়া যায়, কিন্তু ছোট ভাইয়ের উপর কর্তৃত্ব নয়। যেমন, “তুমি ভাইকে গল্প পড়ে শোনাতে পারো”, “তুমি খেলার নিয়ম বুঝিয়ে দিতে পারো”, কিন্তু “তুমি ঠিক করবে ভাই কী করবে”, এটা নয়। দায়িত্ব আর নিয়ন্ত্রণের পার্থক্য তাকে ধীরে ধীরে শেখাতে হবে।
বাবা হিসেবে আপনি বড় ছেলের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে পারেন। জিজ্ঞেস করুন, “ভাই তোমার কথা না শুনলে তোমার এত রাগ কেন হয়?” অনেক সময় এই প্রশ্নের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে তার ভয়, বিরক্তি বা মনোযোগের প্রয়োজন।
সবশেষে, ভাইদের মধ্যে তুলনা করবেন না। “তুমি বড়, তোমারই বুঝতে হবে” বললে বড় ছেলের ওপর চাপ বাড়ে। আবার “ছোটকে সবসময় ছাড় দাও” বললেও সে অন্যায় মনে করতে পারে। বরং নিয়ম হবে দুজনেরই সম্মান আছে, দুজনেরই পালা আছে।
এমন আচরণ পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এখন থেকেই ঠিক করা ভালো। কারণ ছোট বয়সে সীমা, পালা নেওয়া, অন্যের মতামত শোনা শেখালে ভবিষ্যতে ভাইদের সম্পর্ক আরও সুন্দর হয়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন