
প্রশ্নঃ আমি একজন বাবা। আমার ছেলের বয়স ৮ বছর, ওর ছোট একটা বোন আছে। পড়াশোনা বা খেলাধুলায় একটু ভুল হলেই নিজের ওপর খুব রেগে যায়। খাতাও ছিঁড়ে ফেলে। সব কাজ একদম নিখুঁত করতে চায়। ওকে কীভাবে বুঝাব যে ভুল করাও শেখারই অংশ?
৮ বছর বয়সী শিশুর পড়াশোনা বা খেলাধুলায় একটু ভুল হলেই নিজের ওপর খুব রেগে যাওয়া, খাতা ছিঁড়ে ফেলা, বা সবকিছু একদম নিখুঁত করতে চাওয়া শুধু “রাগ” বা “জেদ” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। অনেক সময় এর পেছনে থাকে ব্যর্থতার ভয়, নিজের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা, অথবা মনে করা, “আমি ভুল করলে আমি ভালো না।”
এই বয়সে অনেক শিশু নিজের দক্ষতা নিয়ে সচেতন হতে শুরু করে। স্কুলে কে কত ভালো লিখছে, কে খেলায় জিতছে, কে দ্রুত অঙ্ক করছে, এসব তুলনা তাদের চোখে পড়ে। যদি সে মনে করে, ভালোবাসা বা প্রশংসা পাওয়ার জন্য সবসময় সবকিছু সঠিক করতে হবে, তাহলে ছোট ভুলও তার কাছে বড় ব্যর্থতার মতো মনে হতে পারে।
তাই অভিবাবকদের প্রথম কাজ হলো, শিশুর অনুভূতিকে ছোট না করা। সে খাতা ছিঁড়ে ফেললে শুধু “এত রাগ করো কেন?” বললে সে আরও লজ্জা বা রাগ অনুভব করতে পারে। বরং শান্তভাবে বলা যায়, “তুমি ভুল হওয়ায় খুব বিরক্ত হয়েছ, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু খাতা ছিঁড়ে ফেললে সমস্যার সমাধান হয় না।” অর্থাৎ অনুভূতি বুঝবেন, কিন্তু আচরণের সীমাও পরিষ্কার করবেন।
দ্বিতীয়ত, ভুলকে স্বাভাবিক করার ভাষা ঘরে নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে। যেমন, “ভুল হলে আমরা আবার চেষ্টা করি”, “ভুল আমাদের দেখায় কোথায় শিখতে হবে”, “প্রথমবারেই সব ঠিক হতে হবে, এমন না।” এই কথাগুলো শুধু শিশুকে বললেই হবে না; বাবা-মাকেও নিজের জীবনে দেখাতে হবে। আপনি কোনো কাজে ভুল করলে বলতে পারেন, “আচ্ছা, এটা ঠিক হলো না। এবার অন্যভাবে করি।” শিশুরা বড়দের দেখে শেখে।
তৃতীয়ত, প্রশংসার ধরন বদলানো জরুরি। শুধু “তুমি ফার্স্ট হয়েছ”, “তুমি সব ঠিক করেছ” বললে শিশুর মনে হতে পারে, ভুল করলে সে মূল্যহীন। বরং বলুন, “তুমি চেষ্টা করেছ”, “ভুলটা ধরতে পেরেছ”, “আগের চেয়ে আজ ভালো হয়েছে”, “তুমি হার না মেনে আবার বসেছ।” এতে সে বুঝবে, ফলাফলের চেয়ে চেষ্টা ও শেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, রাগের সময় ব্যবহার করার জন্য একটি ছোট “শান্ত হওয়ার নিয়ম” বানানো যায়। যেমনঃ পেন্সিল নামিয়ে রাখা, তিনবার গভীর শ্বাস নেওয়া, এক গ্লাস পানি খাওয়া, ৫ মিনিট বিরতি নেওয়া, তারপর আবার চেষ্টা করা। খাতা ছিঁড়লে বা জিনিস ছুড়লে শান্তভাবে বলুন, “রাগ হওয়া ঠিক আছে, কিন্তু জিনিস নষ্ট করা ঠিক নয়। এখন আমরা একটু বিরতি নেব।”
পঞ্চমত, কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন। পুরো পৃষ্ঠা অঙ্ক না দিয়ে বলুন, “আগে তিনটা করি, তারপর দেখি।” খেলাধুলায়ও জেতা-হারার বদলে লক্ষ্য দিন, “আজ শুধু বল পাস করার চেষ্টা করি।” ছোট লক্ষ্য পূরণ করলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তুলনা এড়ানো। “তোমার বোন তো এমন করে না” বা “অন্যরা পারছে, তুমি পারছ না কেন”, এ ধরনের কথা শিশুর নিখুঁত হওয়ার চাপ আরও বাড়ায়। তার বদলে তাকে নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করুন।
যদি শিশুর নিজের ওপর রাগ খুব বেশি হয়, বারবার জিনিস নষ্ট করে, খেলাধুলা বা পড়া এড়িয়ে চলে, ঘুম-খাওয়া কমে যায়, বা নিজেকে “আমি পারি না”, “আমি খারাপ” বলে, তাহলে শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবশেষে, শিশুকে বুঝাতে হবে, ভুল মানে শেষ নয়। ভুল মানে নতুন করে শেখার দরজা খুলেছে। বাবা-মায়ের সঠিক সাপোর্ট এবং চেষ্টা-কেন্দ্রিক প্রশংসা শিশুকে সত্যিকারের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন