
ফাহমিদা বেগমদের বাসাটা খুব ছোট। এক রুমের ভেতরেই ঘুম, রান্না, পড়াশোনা সব চলে। স্বামীর কাজ কখনো থাকে, কখনো থাকে না। মাসের শেষে টাকার চিন্তা, বাসা ভাড়ার চাপ, বাচ্চাদের স্কুলের খরচ এসব নিয়ে ঘরে অশান্তি হওয়াও নতুন কিছু না। তবু আশেপাশের অনেকেই একটা বিষয় খেয়াল করে যে তাদের বাসায় গেলে বাচ্চাদের মুখে ভয় কম, হাসি বেশি। কারণ ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ সবসময় টাকার ওপর নির্ভর করে না। অনেক সময় এটি নির্ভর করে ঘরের মানসিক অবস্থার ওপর।
শিশু বিকাশবিষয়ক গবেষণাগুলো বলছে, শিশুদের মানসিক সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো মানসিক নিরাপত্তা। অর্থাৎ শিশুটি কি বাসায় নিজেকে নিরাপদ, ভালোবাসাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য মনে করছে?
কম আয়ের পরিবারে আর্থিক চাপ বেশি থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি ঘরে সারাক্ষণ চিৎকার, অপমান, ভয় বা হতাশার পরিবেশ থাকে, তাহলে তা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ফাহমিদা আগে ক্লান্তি আর টেনশনের কারণে ছোট ছোট বিষয়েও বাচ্চাদের ওপর চিৎকার করতেন। পরে তিনি খেয়াল করেন, এতে বড় মেয়েটা অনেক চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছেলেটাও বেশি রেগে যাচ্ছে। যেহেতু শিশুরা শুধু কথাই শোনে না, ঘরে কী ধরনের পরিবেশ বিরাজ করছে সেটাও অনুভব করে, তাই ইতিবাচক পরিবেশ মানে সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকা না, বরং সমস্যা থাকলেও শিশুকে এমন অনুভব করানো “আমরা একসাথে আছি।”
ফাহমিদা পরে ছোট কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। যেমন, রাতে খাওয়ার সময় এখন তারা চেষ্টা করেন অন্তত কিছুক্ষণ একসাথে বসতে। খাবার খুব সাধারণ হলেও, যেমনঃ ডাল, ভর্তা, ডিম; তবু সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে একটা পারস্পরিক বন্ধন তৈরি হয়।
কারণ পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের সঙ্গে পরিবারের বন্ধন শক্তিশালী করতে এবং তাদের যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের সামনে বড়দের একে অপরকে সম্মান করা। কারণ কম আয়ের পরিবারে চাপ বেশি থাকায় অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াও বেশি হয়। কিন্তু যদি নিয়মিত অপমান, দোষারোপ বা চিৎকার শিশুর সামনে হয়, তাহলে শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তাই ফাহমিদা আর তার স্বামী এখন অন্তত একটা জিনিস চেষ্টা করেন, বাচ্চাদের সামনে “তুমি কিছু পারো না” ধরনের কথা না বলা। কেননা অশান্ত পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের উদ্বেগ এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবসময় অর্থের প্রয়োজন হয় না; ছোট ছোট মানসিক ও পারিবারিক অভ্যাসও এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যেমন—
• শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা
• ছোট সাফল্যে প্রশংসা করা
• ভুল করলে অপমান না করা
• প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় একসাথে থাকা
• “তুমি আমাদের জন্য বোঝা” ধরনের কথা না বলা
ফাহমিদার বড় মেয়েটা একদিন ছোট ভাইকে খাওয়াচ্ছিল। তখন ফাহমিদা তাকে বলেছিলেন,
“তুই অনেক সাহায্য করিস।” ফাহমিদার এই ছোট্ট প্রশংসাটুকুও তার মেয়ের আত্মবিশ্বাস ও নিজের প্রতি মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটি বিষয় অনেক কম আয়ের পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা নিজেদের মানসিক চাপের কারণে মানসিকভাবে অনেক সময় শিশুর জন্য উপস্থিত থাকতে পারেন না। সারাদিনের কষ্টের পর কারও সঙ্গে কথা বলার শক্তিও থাকে না। এটা স্বাভাবিক, কারণ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মানুষের ধৈর্য এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে বাবা-মায়ের নিজের মানসিক সুস্থতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ফাহমিদা মাঝে মাঝে বাসার সামনে অন্য মায়েদের সাথে গল্প করেন, ছাদে কিছুক্ষণ হাঁটেন, বা বাচ্চাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করেন। এগুলো ছোট জিনিস মনে হলেও, তার মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইতিবাচক পরিবেশ মানে “পারফেক্ট লাইফ” না।
শিশুরা অভাব বুঝতে পারে। কিন্তু তারা আরও বেশি বুঝতে পারে, ঘরে ভালোবাসা আছে কিনা। সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক অনেক সময় আর্থিক কষ্টের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। অর্থাৎ টাকার অভাব থাকলেও যদি শিশুর মানসিক সমর্থন শক্তিশালী হয়, তাহলে সে মানসিকভাবে বেশি সহনশীল হয়ে বড় হতে পারে।
ফাহমিদাদের বাসায় হয়তো দামি আসবাবপত্র নেই, আলাদা পড়ার ঘর নেই্, দামী খেলনা নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে সবাই মিলে ছাদে বসে বাতাস খাওয়া, বিদ্যুৎ চলে গেলে গল্প করা, ঈদের পরে একসাথে সেমাই রান্না করা, এগুলোই তাদের বাচ্চাদের মনে নিরাপত্তা আর আনন্দের স্মৃতি তৈরি করে। কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “কত টাকা আছে” না; বরং “তার ঘরের পরিবেশ তাকে কেমন অনুভূতি দেয়।”
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন