লোগো

স্কুলে বেশি কথা বলে, বাসায় চুপচাপ: শিশুর আচরণ এত আলাদা কেন হতে পারে?

স্কুলে বেশি কথা বলে, বাসায় চুপচাপ: শিশুর আচরণ এত আলাদা কেন হতে পারে?

প্রশ্নঃ আমি একজন মা। আমার ছেলের বয়স ৭ বছর, ওর ছোট একটা ভাই আছে। স্কুল থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসে, ও নাকি ক্লাসে অনেক কথা বলে। কিন্তু বাসায় এসে দেখছি, ও খুব চুপচাপ। আমি বুঝতে পারছি না আসলে কোনটা ওর স্বাভাবিক আচরণ। এমন হলে কী করা উচিত?

৭ বছর বয়সী শিশুর স্কুলে খুব কথা বলা, কিন্তু বাসায় এসে চুপচাপ থাকা দেখে একজন মায়ের বিভ্রান্ত হওয়া খুব স্বাভাবিক। মনে হতে পারে, “আসলেই আমার ছেলে কেমন? স্কুলে যা বলছে, সেটা কি সত্যি? নাকি বাসায় ও অন্যরকম?” আসলে শিশুর আচরণ সব জায়গায় একই হয় না সবসময়।  স্কুল, বাসা, বন্ধু, শিক্ষক, ভাইবোন, প্রতিটি পরিবেশ শিশুর আচরণে আলাদা প্রভাব ফেলতে পারে।
স্কুলে শিশু অনেক সময় বন্ধুদের মাঝে বেশি উত্তেজিত থাকে। ক্লাসে প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে চায়, নিজের কথা শোনাতে চায়। ৭ বছর বয়সে সামাজিক হওয়া, নিজের মত প্রকাশ করতে চাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি সে ক্লাসের নিয়ম ভেঙে বারবার কথা বলে, শিক্ষকের কথা মাঝখানে থামায় বা অন্যদের পড়ায় সমস্যা তৈরি করে, তখন বিষয়টা একটু মনোযোগ দিয়ে দেখা দরকার।
অন্যদিকে বাসায় এসে চুপচাপ থাকা মানেই সে দুঃখী বা সমস্যায় আছে, এমনও নয়। স্কুলে সারাদিন কথা বলা, নিয়ম মানা, বন্ধুদের সঙ্গে মেশার পর সে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। অনেক শিশু বাইরে বেশি সক্রিয় থাকলেও বাসায় এসে শান্ত থাকতে চায়। আবার ছোট ভাই থাকলে বাসায় এসে সে হয়তো নিজের জায়গা, নিজের শান্ত সময় খুঁজছে।
প্রথমে স্কুলের অভিযোগকে সরাসরি শাস্তির বিষয় বানানো ঠিক হবে না। শিশুকে “তুমি ক্লাসে এত কথা বলো কেন?” বলার বদলে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করা যায়, “ক্লাসে কখন তোমার বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে?” বা “তুমি কি বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতে কষ্ট পাও?” এতে সে নিজের আচরণ বুঝতে শেখে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। শুধু “ও কথা বলে” শুনলেই হবে না। জানতে হবে কোন সময়ে বেশি কথা বলে? পড়ার সময়, বিরতির আগে, বন্ধু পাশে থাকলে, নাকি কোনো কাজ কঠিন লাগলে? কারণ না বুঝলে সমাধানও ঠিক হবে না। অনেক সময় শিশুর কথা বলা মনোযোগের সমস্যা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, ক্লাসের কাজ না বোঝা, বা বন্ধুদের সঙ্গে মেশার আগ্রহ, যেকোনো কারণে হতে পারে।
তৃতীয়ত, বাসায় তাকে “চুপচাপ কেন?” বলে চাপ না দিয়ে নিরাপদ কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। স্কুল থেকে ফিরেই জেরা না করে আগে বিশ্রাম, নাশতা, একটু খেলা বা শান্ত সময় দিন। পরে সহজভাবে বলুন, “আজ স্কুলে মজার কী হলো?” 
চতুর্থত, ক্লাসে কথা বলার জন্য ছোট নিয়ম শেখানো যায়। যেমনঃ হাত তুলে কথা বলা, শিক্ষক কথা শেষ করলে বলা, বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার জন্য বিরতি পর্যন্ত অপেক্ষা করা। বাড়িতে রোল প্লে করেও অনুশীলন করা যায়। “ধরো তুমি ক্লাসে কিছু বলতে চাও, তখন কী করবে?”, এভাবে খেলাচ্ছলে শেখালে শিশুর জন্য সহজ হয়।
যদি দেখা যায়, শুধু স্কুলে নয়, বাড়ি, খেলা, পড়া ইত্যাদি সব জায়গাতেই সে খুব ইম্পালসিভ, অপেক্ষা করতে পারে না, নির্দেশনা মানতে কষ্ট হয় বা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবশেষে, স্কুলে বেশি কথা বলা আর বাসায় চুপ থাকা, দুটোই শিশুর স্বাভাবিক আচরণের অংশ হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন অভিযোগ নয়, কারণ বোঝা; শাস্তি নয়, নিয়ম শেখানো; আর মা-বাবা ও শিক্ষকের একসঙ্গে সহযোগিতা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...