লোগো

গল্প বলা শিশুর ইম্যাজিনেশন বাড়ায় কিভাবে?

গল্প বলা শিশুর ইম্যাজিনেশন বাড়ায় কিভাবে?

শাহ আলম রাতে কাজ শেষে বাসায় ফিরলে তার তিন বছরের ছেলে রাফি প্রায়ই বলে, “আব্বু, গল্প বলো।” প্রথমদিকে শাহ আলম অস্বস্তিতে পড়ে যেত। সে তো খুব বেশি পড়াশোনা জানে না, বইয়ের গল্পও মুখস্থ নেই। তাই মাঝে মাঝে এড়িয়ে যেত। কিন্তু এক রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। অন্ধকার ঘরে বসে সে হঠাৎ বানিয়ে বানিয়ে একটা গল্প বলা শুরু করে, একটা ছোট্ট বিড়াল আর হারিয়ে যাওয়া লাল জুতার গল্প। গল্প শেষ হওয়ার পর রাফির চোখদুটো চকচক করছিল। পরদিনও সে একই গল্প আবার শুনতে চাইল। সেদিন শাহ আলম বুঝতে পারে, শিশুর কাছে গল্প শুধু বিনোদন না, এটা তার চিন্তা করার জগৎ খুলে দেয়।

শিশু মনোবিজ্ঞান ও মস্তিষ্কবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, গল্প শোনা ছোট শিশুদের ইম্যাজিনেশন বা কল্পনাশক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন শিশু গল্প শোনে, তখন সে শুধু শব্দ শুনে না বরং নিজের মাথার ভেতরে ছবি তৈরি করতে শুরু করে।
যেমন, “একটা বড় নীল পাখি আকাশে উড়ছিল”,  এই কথা শুনলে শিশুর মস্তিষ্ক নিজেই সেই দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করে। এই মানসিক ছবি তৈরি করার ক্ষমতাই ইম্যাজিনেশন এর ভিত্তি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইম্যাজিনেশন শুধু “কল্পনা” না। এটা ভবিষ্যতে সমস্যা সমাধান, সৃজনশীল চিন্তা এবং ভাষা শেখার সাথেও সম্পর্কিত।
রাফি এখন গল্প শুনে নিজেও নতুন কিছু বানাতে শুরু করেছে। কখনো বলে তার খেলনা গাড়ি চাঁদে যাবে, কখনো বলে বৃষ্টির পানিতে মাছ থাকে। বড়দের কাছে এগুলো অদ্ভুত মনে হলেও আসলে এভাবেই শিশুর সৃজনশীল চিন্তা তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়মিত গল্প শোনে, তাদের ভাষা শেখা ও ইমোশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং তুলনামূলক ভালো হয়। কারণ গল্পের মাধ্যমে তারা নতুন শব্দ শেখে, মানুষের অনুভূতি বোঝে, আর বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে শেখে।
শাহ আলম আগে ভাবত গল্প মানে শুধু বই। এখন সে বুঝেছে, নিজের জীবনের ছোট ঘটনাও গল্প হতে পারে।
যেমন—
•    ছোটবেলার গ্রামের গল্প 
•    বৃষ্টির দিনের গল্প 
•    দোকানে দেখা মজার মানুষের গল্প 
•    কোনো প্রাণীর গল্প 
•    কল্পনার ট্রেন বা উড়ন্ত রিকশার গল্প 
এসব গল্প শিশুর কাছে খুব আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, গল্প বলার সময় এর সময় যখন বাবা-মা শিশুর সাথে কথা বলেন, প্রশ্ন করেন বা শিশুর উত্তর শোনেন, তখন শিশুর ব্রেইন কানেকশন আরও শক্তিশালী হয়।
যেমন, শাহ আলম এখন গল্প বলার সময় মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, “তারপর কী হইতে পারে?” রাফি তখন নিজের মতো উত্তর দেয়। এতে তার ইম্যাজিনেশন-এর পাশাপাশি ডিসিশন মেকিং ও ল্যাঙ্গুয়েজ স্কিল -ও বাড়ছে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— গল্প শিশুর ইমোশনাল ডেভেলপমেন্ট -এও সাহায্য করে।
যখন শিশু গল্পে ভয়, আনন্দ, কষ্ট বা সাহসের ঘটনা শোনে, তখন সে বিভিন্ন অনুভূতি বুঝতে শেখে। এমনকি নিজের ভয় বা দুঃখ নিয়েও ভাবতে শেখে।
নিম্ন আয়ের পরিবারে অনেক সময় বাবা-মায়ের আলাদা করে সন্তানের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ কম থাকে। সারাদিনের কাজের পর সবাই ক্লান্ত থাকে। কিন্তু রাতে মাত্র ১০–১৫ মিনিট গল্প বলাও শিশুর জন্য অনেক মূল্যবান হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঘুমানোর আগে গল্প বলা শিশুর সাথে ইমোশনাল বন্ডিং বাড়াতে সাহায্য করে। এতে শিশু নিরাপদ অনুভব করে এবং তার মানসিক সংযোগ শক্তিশালী হয়।
শাহ আলম এখন মাঝে মাঝে গল্প বানাতে না পারলে রাফিকেই বলে, “তুমি একটা গল্প বানাও।” তখন রাফি অদ্ভুত সব কল্পনার কথা বলে, যেমনঃ কথা বলা কাক, উড়ন্ত বাস, নদীতে থাকা ডাইনোসর।
এসব শুনে শাহ আলম হাসে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বুঝতে পারে, এই কল্পনাগুলোই তার সন্তানের চিন্তার জগৎ বড় করছে।
হয়তো তাদের বাসায় দামি খেলনা বা বড় লাইব্রেরি নেই। কিন্তু একটা গল্প, একটু সময় আর কাছের মানুষের কণ্ঠ, এগুলো দিয়েও শিশুর মনের ভেতর বিশাল একটা পৃথিবী তৈরি হতে পারে।
কারণ অনেক সময় একটা শিশুর ইম্যাজিনেশন শুরু হয় ঘুমানোর আগে শোনা খুব সাধারণ একটা গল্প থেকে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000