
ব্যবসার কাজের কারণে আমার দিনের বড় একটা সময় বাইরে কাটে। তাই যমজ ছেলেরা জন্মানোর পর প্রথম কয়েক মাস আমার ভেতরে একটা অদ্ভূত ভয় কাজ করত— “ওরা কি আমাকে যথেষ্ট চিনবে?”, “মায়ের সাথে যেমন কম্ফোর্ট ফিল করে, আমার সাথেও কি করবে?” শুরুতে আমি ভাবতাম, শিশুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা মানে অনেক বড় কিছু। পরে বুঝলাম, ছোট ছোট মুহূর্তই আসলে সবচেয়ে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করে। আর শিশুর সঙ্গে সেই সম্পর্ক গড়ে তোলার সবচেয়ে স্বাভাবিক উপায়গুলোর একটি হলো “খেলা”।
শিশুর কাছে খেলা শুধু আনন্দের বিষয় নয়; এটি শেখা, নিরাপত্তা অনুভব করা এবং সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি মাধ্যম। শিশু বিকাশবিষয়ক গবেষণাগুলোতে বারবার দেখা গেছে, শিশুর প্রতি সাড়া দিয়ে খেলা তার মানসিক নিরাপত্তা ও সামাজিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক বাবা মনে করেন, নবজাতক বা খুব ছোট শিশুর সঙ্গে আবার কী খেলা করা যায়! আমিও আগে তাই ভাবতাম। কিন্তু আসলে জন্মের পর থেকেই শিশুরা ইন্টারেকশনের মাধ্যমে শিখতে শুরু করে। আমার ছেলেরা এখনো ছোট, কিন্তু খুব সাধারণ কিছু খেলাই ওদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অনেক সাহায্য করেছে।
সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর খেলাগুলোর একটি হলো “মুখভঙ্গির খেলা” ।
আমি ওদের সামনে বসে হাসি, চোখ বড় করি বা মজার মজার মুখভঙ্গি করি। অবাক করার বিষয় হলো, ওরা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো অনুকরণ করার চেষ্টা করে।
আরেকটি খুব সুন্দর খেলা হলো— “কোথায় বাবা?” খেলা।
একটি ছোট কাপড় বা নিজের হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আবার “এই যে!” বলে সামনে আসা। অনেকেই এটিকে সাধারণ লুকোচুরি খেলা মনে করেন, কিন্তু মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী এই ধরনের খেলা শিশুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, কোনো কিছু চোখের সামনে না থাকলেও সেটি যে অস্তিত্বশীল এই ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
আমাদের আগের প্রজন্মের অনেকেই বলেন, “এত ছোট বাচ্চা আবার কী বোঝে?” কিন্তু সত্যি বলতে, শিশুরা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি পর্যবেক্ষণ করে।
আরেকটি খেলা আমরা প্রায়ই করি “শব্দ অনুকরণ” ।
আমি “আআ”, “বাবাবা”, “উউ” ধরনের শব্দ করি, আর ওরাও সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও, এ ধরনের আদান-প্রদান শিশুর ভাষা শেখার ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে পালাক্রমে শব্দের আদান-প্রদান শিশুর যোগাযোগ দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শরীরের নড়াচড়া নিয়েও ছোট ছোট খেলা করা যায়। যেমন—
• ধীরে ধীরে হাত নাড়ানো
• পা ছুঁয়ে ছড়া বলা
• কোলে নিয়ে হালকা দোলানো
• উপুড় হয়ে থাকার সময় খেলনা দেখানো
এসব শুধু আনন্দের জন্য নয়; এগুলো শিশুর ইন্দ্রিয়গত বিকাশ এবং চলাফেরার দক্ষতা গড়ে তুলতেও সাহায্য করে।
তবে একটি বিষয় আমি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি “স্ক্রিননির্ভর সম্পর্ক গড়ে তোলা” ।
অনেক সময় আমরা মনে করি, একসঙ্গে কার্টুন দেখাও সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি উপায়। কিন্তু ছোট শিশুর ক্ষেত্রে বাস্তব মানুষের সঙ্গে মেলামেশা অনেক বেশি কার্যকর। শিশুর মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি শেখে সরাসরি প্রতিক্রিয়া থেকে, স্ক্রিন থেকে নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খেলার সময় পুরো মনোযোগ দেওয়া।
আগে আমি মাঝে মাঝে ফোন হাতে নিয়েই ওদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, শিশুরা চোখের যোগাযোগ এবং মনোযোগ খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারে। তাই এখন যখন বাচ্চাদের সামনে যাই তখন ফোন দূরে রাখি। শুধু ওদের প্রতিক্রিয়া দেখি, কথা বলি আর খেলি।
যৌথ পরিবারে আরেকটি বিষয় দেখা যায়, সবাই শিশুকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে। এটা অবশ্যই ভালো। তবে বাবা হিসেবে নিজেরও আলাদা সময় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ শিশুর আত্মবিশ্বাস এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে সম্পর্ক গড়ে তোলার এসব খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “নিখুঁত হওয়া নয়, নিয়মিত হওয়া”। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ব্যস্ত জীবনে ১৫–২০ মিনিটের আন্তরিক সময়ও অনেক মূল্যবান হতে পারে।
আজকাল বাসায় ফিরলে আমি দরজার কাছে দাঁড়াতেই ছেলেরা হাত-পা নাড়ায়, শব্দ করে। তখন মনে হয়, শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে দামি খেলনা বা জটিল কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না।
শিশুর কাছে সবচেয়ে বড় খেলা হলো বাবার মনোযোগ, হাসি আর উপস্থিতি।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন