
এখনকার সময়ে ছোট বাচ্চাকে কিছুক্ষণ শান্ত রাখতে গেলেই সবার আগে মোবাইলের কথা মাথায় আসে। সত্যি বলতে, আমি নিজেও এর বাইরে ছিলাম না। আমার ছেলে যখন বেশি কান্না করত বা আমি রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকতাম, তখন কার্টুন চালিয়ে দেওয়া অনেক সহজ সমাধান মনে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, মোবাইল বেশি দেখার দিনগুলোতে ও বেশি রেগে যাচ্ছে, মনোযোগ কমে যাচ্ছে, আর ছোট ছোট জিনিসেও বিরক্ত হচ্ছে। তখন থেকেই ভাবতে শুরু করি, স্ক্রিন ছাড়া কি ওকে আনন্দ দেওয়া সম্ভব?
পরে বুঝলাম, সম্ভব তো অবশ্যই, বরং অনেক সময় শিশুর জন্য আরও ভালো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ -এর জন্য বাস্তব খেলাধুলা, কথা বলা, নড়াচড়া আর কল্পনাভিত্তিক খেলাধুলা অনেক বেশি উপকারী। কারণ এগুলো শিশুর চিন্তা, ভাষা, সামাজিক আচরণ আর আবেগগত বিকাশ -এ সাহায্য করে।
আর মজার বিষয় হলো, এসব করতে সবসময় অনেক টাকা লাগে না।
আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারেও খুব সাধারণ কিছু জিনিস দিয়েই শিশুকে সুন্দরভাবে ব্যস্ত রাখা যায়।
১. বালিশ ও চাদর দিয়ে ছোট্ট ঘর বানানো
এটা আমার ছেলের সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটা। বালিশ, চেয়ার আর চাদর দিয়ে ছোট্ট “ঘর” বানিয়ে সেখানে বসে গল্প করা বা খেলনা নিয়ে খেলা।
এতে শিশুর কল্পনা করার ক্ষমতা বাড়ে। একই সাথে ওরা নিজেদের একটা “বিশেষ জায়গা” পেয়েছে বলেও অনুভব করে।
২. রান্নাঘরের নিরাপদ জিনিস দিয়ে খেলা
সব খেলনা কিনতে হবে এমন না। প্লাস্টিকের বাটি, কাঠের চামচ, খালি ডাব্বা, এসব দিয়েও ছোট শিশুরা অনেক আনন্দ পায়।
আমি মাঝে মাঝে ছেলেকে ডাল আলাদা করতে দিই বা কাপ সাজাতে দিই। এতে ও খুশিও হয়, আবার হাতের কাজ শেখেও।
৩. ছবি দেখে গল্প বানানো
পুরোনো বই বা ম্যাগাজিনের ছবি দেখিয়ে গল্প বানানো খুব মজার একটা খেলা।
যেমন:
“এই ছেলেটা কোথায় যাচ্ছে?”
“এই বিড়ালটা কী করছে?”
এতে শিশুর ভাষা আর কল্পনাশক্তি বাড়ে।
৪. ছাদ বা বারান্দায় প্রকৃতি দেখা
সবসময় পার্কে যাওয়ার দরকার হয় না। অনেক সময় শুধু ছাদে গিয়ে আকাশ দেখা, পাখি দেখা, বাতাসে দাঁড়ানোও শিশুর জন্য অনেক আনন্দের হতে পারে।
আমার ছেলে এখন মেঘ দেখেও গল্প বানায়।
৫. বালতি ও পানি দিয়ে খেলা
গরমের দিনে ছোট্ট একটা বালতিতে পানি নিয়ে কাপ ভরানো, ঢালা শিশুদের খুব আনন্দ দেয়।
এতে sensory learning ((ইন্দ্রিয়ভিত্তিক শেখা) )-ও হয়। তবে অবশ্যই বড়দের নজরদারিতে করতে হবে।
৬. ছড়া ও অভিনয়ের খেলা
শুধু ছড়া শোনানো না, অভিনয় করে দেখানোও অনেক মজার।
আমরা মাঝে মাঝে পশুপাখির ডাক অনুকরণ করি।
“গরু কীভাবে ডাকে?”
“বিড়াল কীভাবে হাঁটে?”
এতে শিশুর পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়।
৭. ঘরের ভেতর গুপ্তধন খোঁজার খেলা
আমি কখনো ছোট খেলনা লুকিয়ে বলি,
“খুঁজে বের করো তো!”
এতে শিশুর পর্যবেক্ষণ দক্ষতা ও আগ্রহ দুটোই বাড়ে।
৮. একসাথে আঁকাআঁকি
দামি রংপেন্সিল লাগে না। কয়েকটা সাধারণ রঙ পেন্সিল আর কাগজই যথেষ্ট।
শিশুর আঁকা সুন্দর না হলেও সমস্যা নেই। এই বয়সে আঁকা সৃজনশীলতা ও হাতের নড়াচড়ার দক্ষতা বিকাশে সাহায্য করে।
৯. পুরোনো কাপড় দিয়ে সাজগোজ খেলা
মায়ের ওড়না, বাবার টুপি দিয়ে অভিনয় অভিনয় খেলা করা যায়।
আমার ছেলে কখনো ডাক্তার হয়, কখনো দোকানদার। এই ধরনের অভিনয়ভিত্তিক খেলা শিশুর সামাজিক আচরণ ও বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
১০. পরিবারের সবাই মিলে ছোট খেলা
লুকোচুরি, বল ছোড়া, হাততালি খেলা, এসব খুব সাধারণ, কিন্তু বন্ডিং বাড়াতে অনেক কার্যকর।
বিশেষ করে যখন বাবা-মাও অংশ নেয়, তখন শিশুর আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
আমি একটা জিনিস বুঝেছি, শিশুরা সবসময় দামি দামি খেলনা বা বিনোদন চায় না। তারা আসলে মনযোগ চায়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন